ভারতজুড়ে বিজয়া দশমী মানেই রাবণের কুশপুতুল দাহ, রামের জয়, এবং অশুভ শক্তির বিনাশের আনন্দ। কিন্তু সেই ভারতেই এমন এক এলাকা আছে—পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার চাঁচল মহকুমা, যেখানে রাবণ দাহ নয়, বরং তাঁকে দেবতার মর্যাদায় পূজা করা হয়। হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন! এই অনন্য প্রথা বহন করে চলেছে একাধিক পরিবার, চার প্রজন্ম ধরে, যেখানে রাবণকে ত্যাগ ও জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। এ পুজো যেন রাবণের অন্য এক রূপ—খলনায়ক নয়, বরং ব্রহ্মজ্ঞ, শিবভক্ত ও তপস্বী রাবণ।
স্থানীয় লোককথা ও পারিবারিক বংশগাঁথা অনুযায়ী, এই পুজোর সূচনা হয় প্রায় ২০০ বছর আগে। তখন মালদা অঞ্চলে ছিল কিছু তান্ত্রিক ও শৈব সম্প্রদায়ের প্রভাব। তাঁরা রাবণকে দেখত ভগবান শিবের পরম ভক্ত হিসেবে, অসাধারণ বেদজ্ঞ ও ধ্যানী রূপে। চাঁচলের কয়েকটি উচ্চবর্ণের পরিবার, বিশেষত ব্রাহ্মণ ও রাজবংশীয় কিছু পরিবার, এই রাবণ-ভক্তি চর্চা করতেন নিঃশব্দে। ক্রমশ, এই রীতিকে লোকবিশ্বাস রূপে গ্রহণ করে স্থানীয় জনসাধারণ।
রাবণকে সাধারণত খলনায়ক হিসেবে দেখা হলেও, অনেক শাস্ত্র ও গ্রন্থে তাঁর জ্ঞান, শিবভক্তি ও তপস্যা নিয়ে বিস্তর প্রশংসা আছে। তিনি ছিলেন— দশগ্রন্থজ্ঞ (দশ মুখ = দশ জ্ঞান), ভগবান শিবের শিবতাণ্ডব স্তোত্র রচয়িতা, এক মহান রাজার মতো সংগঠিত শাসক এবং এক ভয়ঙ্কর অহংকারের বলি হওয়া ব্যক্তি। চাঁচলের মানুষজন মনে করেন— 'রাবণের খারাপ কাজ যেমন আছে, তেমন তাঁর গুণেরও অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে ঘৃণা নয়, বিচারসহকারে দেখাটাই প্রকৃত ধর্ম।'
চাঁচলের এই রাবণ পূজা হয় খুব ঘরোয়াভাবে, ধুমধাম নয়—শান্তি ও ভক্তির আবহে। দশমীর দিন এই বিশেষ পূজা হয় এবং তা চলে প্রায় তিন প্রজন্ম ধরে নিরবিচারে। পূজার মূল দিকগুলো হলো— একে রাবণ পূজা না বলে 'রাবণ স্মরণ' বলা হয়। ভক্তরা রাবণের দশমুখের প্রতীক হিসেবে দশটি প্রদীপ জ্বালান। একটি কাঠের ফলক বা কাপড়ে আঁকা রাবণ চিত্রে চন্দন, ফুল, ধূপ আর চাল-তিলের অর্ঘ্য দেওয়া হয়। পাঠ করা হয় ‘শিবতাণ্ডব স্তোত্র’। ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় পায়েস, দুধ ও ফলমূল। কোনও মূর্তি নয়, কোনও উন্মাদনা নয়—শান্তভাবে রাবণকে স্মরণ করে তাঁর পাণ্ডিত্য ও শিবভক্তির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
স্থানীয় প্রবীণরা বলেন— 'আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এখানে রাবণ দাহ হয় না। আমরা জানি, তিনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান, ব্রহ্মচিন্তা এবং শিবভক্তির গুরুত্বও কম নয়।' একজন গৃহিণী জানান— 'আমার ঠাকুরদা করতেন, বাবা করেন, এখন আমরা করি। এই পুজো আমাদের বিশ্বাস—শুধু খলনায়ক নয়, রাবণ আমাদের ধর্মীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।'
এই পুজো আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব সবসময় একরৈখিক নয়। রাবণ যেমন ভুল করেছিলেন, তেমনই তিনি ছিলেন এক গুণী ব্যক্তি। এই পূজা সহিষ্ণুতা, বিচারবুদ্ধি ও সত্যের বহুমাত্রিক উপলব্ধির এক মূর্ত প্রতীক।