'এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে… তত কম মানে'- তাই বিদ্যালয় তুলে দিয়ে সব পড়াশুনা বন্ধ করা হোক, হীরক রাজার নিদান। কী মিল পাচ্ছেন আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে? অবাক হচ্ছেন, আরে এটা তো বাঙালীর আইকনিক সিনেমার ডায়লগ, কিন্তু বর্তমান সময়ের সাথে কি সুন্দর মিলে যাচ্ছে। আজ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় আগে, ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ রায় আমাদের উপহার দিয়েছিলেন তাঁর অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ছোটদের রূপকথা বা কমার্শিয়াল ফিল্ম মনে হলেও, এর পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্লেষ। তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিটির প্রাসঙ্গিকতা আজ ২০২৬ সালের আধুনিক ডিজিটাল সমাজে এসে একটুও কমেনি, বরং এর ভেতরের রূপকগুলো আজ আরও বেশি বাস্তব ও প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
চলচ্চিত্রে হীরক রাজার বিজ্ঞানী একটি ‘মগজ ধোলাই যন্ত্র’ আবিষ্কার করেছিলেন, যার কাজ ছিল ভিন্নমতাবলম্বীদের চিন্তাভাবনা মুছে দিয়ে শাসকের চাপিয়ে দেওয়া বুলি তাদের মুখে ফুটিয়ে তোলা। আজ সেই মগজ ধোলাইয়ের জন্য কোনো বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার বা যান্ত্রিক ল্যাবরেটরির প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের হাতের স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিখুঁত অ্যালগরিদম আজ সেই কাজটি অনায়াসে করে চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ মানুষকে ঠিক সেটাই দেখাচ্ছে, যা সে দেখতে বা বিশ্বাস করতে পছন্দ করে। এর ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে এক চরম অন্ধত্ব ও মেরুকরণ, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন চিন্তাশক্তি হারিয়ে এক একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের অন্ধ অনুসারীতে পরিণত হচ্ছে। হীরক রাজ্যের সেই বিখ্যাত সংলাপ "বাকি রাখা খাজনা, লাটে ওঠা বাজনা" আজ আর শুধু চলচ্চিত্রের সংলাপ হয়ে আটকে নেই। বর্তমান কর্পোরেট পুঁজিপতিদের যুগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর আকাশছোঁয়া পরোক্ষ কর, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারের বাণিজ্যিকীকরণ সাধারণ মানুষকে এক অদৃশ্য করের জালে জর্জরিত করে ফেলেছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন আজ ঋণের দায়ে ও করের বোঝায় ওষ্ঠাগত, অথচ বড় বড় কর্পোরেটদের ক্ষেত্রে নিয়মের শিথিলতা দেখা যায়। ঠিক যেন হীরক রাজ্যের শোষণেরই এক আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্করণ।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে শিক্ষার ওপর। হীরক রাজা প্রথম আক্রমণ করেছিলেন উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালায়, কারণ রাজা জানতেন মানুষ শিক্ষিত হলে প্রশ্ন করবে এবং প্রশ্ন করলেই রাজতন্ত্র বিপন্ন হবে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও বিশ্বজুড়ে মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করা, ইতিহাস বিকৃত করা এবং স্বাধীন সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রবণতা সেই সত্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটায়। আজকের শিক্ষাব্যবস্থাও অনেক সময় প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে কেবল 'চাকরি পাওয়ার রোবট' তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন করার মৌলিক অধিকারকে শুরুতেই দমিয়ে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রের বিজ্ঞানী বা 'যন্ত্রী' তাঁর মেধা ব্যবহার করেছিলেন স্বৈরাচারী রাজাকে সাহায্য করতে এবং মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে। আজকের দিনেও পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যারের সাহায্যে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে নজরদারি চালানো, কিংবা ফেক নিউজ ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে সত্যকে আড়াল করার খেলা চলছে। প্রযুক্তি যখনই জনকল্যাণের বদলে শাসকের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখনই তা হীরক রাজার বিজ্ঞানীর মগজ ধোলাই যন্ত্রের মতোই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
সত্যজিৎ রায়ের দূরদর্শিতা এখানেই যে, হীরক রাজা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বা দেশের একক কোনো শাসক নয়; এটি আসলে একটি স্বৈরাচারী মানসিকতা। যখনই কোনো সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায় এবং শাসকের চাটুকারিতাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নেয়, তখনই সেই সমাজ অজান্তেই ‘হীরক রাজার দেশে’ পরিণত হয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই কালজয়ী চলচ্চিত্র আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মগজের স্বাধীনতা আর প্রশ্ন করার অধিকারটুকুই মানুষের বেঁচে থাকার আসল সম্পদ, যা কোনো শাসকের কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। তবে মজার বিষয়, সত্যজিৎ রায় চাইলেই, খারাপ রাজার সাথে ভালো রাজাকে পরিবর্তন করতে পারতেন। কিন্তু 'পাওয়ার কোরাপ্ট', তিনি সেটা না করে গোটা স্বৈরাচারতন্ত্রকেই মূল থেকে উঠিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। উদয়ন পন্ডিত জোর গলায় বলেছিলেন, 'দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান'.....অন্ধকার সরে তো আলো-ই আসে, তাই নয় কি।