মণি ভট্টাচার্য: 'এসেছে নুতন শিশু তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।' সুকান্ত ভট্টাচাযের লাইনটি আজ একটু খাতায় কলমে লিখতে ইচ্ছে করছে, কারণ জানেন? সামনের টিভি স্ক্রিনে যে সমস্ত নিউজ চ্যানেলগুলি রয়েছে সবাই জ...
মণি ভট্টাচার্য: 'এসেছে নুতন শিশু তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।' সুকান্ত ভট্টাচাযের লাইনটি আজ একটু খাতায় কলমে লিখতে ইচ্ছে করছে, কারণ জানেন? সামনের টিভি স্ক্রিনে যে সমস্ত নিউজ চ্যানেলগুলি রয়েছে সবাই জাহাঙ্গীর খান অর্থাৎ স্বঘোষিত পুষ্পার পরাজয় দেখাচ্ছে। আদতে হয়েছেও তাই, কিন্তু আমি বিষয়টি কেবল পরাজয় হিসেবে দেখতে নারাজ। পুষ্পা একজন সিনেমার চরিত্র হলেও বাস্তবের পুষ্পা আরও কয়েকধাপ উপরেই ছিলেন। যিনি ভরা বাজারে মানুষকে চড় মারা থেকে শুরু করে গোধূলির আকাশে গুলির নির্মম আওয়াজ, সবই ওনার ক্যালমা ছিল। নিঃস্তব্ধ সন্ত্রাস চালাতেন এই ফলতায়। কিন্তু শেষ মেশ, চিরদিন কারোর সমানও নাহি যায়, ফলতায় এই পুনর্নির্বাচনের ফলাফল জাহাঙ্গীরকে পলিটিক্যালি শেষ করে দিল, এখন দেখার প্র্যাকটিক্যালি ‘পুষ্পা’র অধ্যায়ের শেষ কবে হয় কিংবা কিভাবে হয়?
ফলতার জাহাঙ্গীর খান ওরফে ‘পুষ্পা’র উত্থান হঠাৎ হয়নি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের প্রশ্রয়েই এলাকায় তার দাপট অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। ক্ষমতার ছায়ায় তৈরি হয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি। পুলিশ পোস্টিং থেকে বিডিও পোস্টিং, বুথ দখল, সিন্ডিকেট, ভাঙচুর , হুমকি, সবকিছুতেই এই জাহাঙ্গীর হয়ে উঠেছিল তথাকথিত 'বসের রাইট হ্যান্ড', ডায়মন্ড হারবার মডেলে এই রাইট হ্যান্ডের ভূমিকাও ছিল অপরিসীম।
একসময় ফলতার রাজনীতিতে নিজেকে কার্যত ‘পুষ্পা’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি। এলাকায় দাপট, প্রকাশ্য হুঙ্কার, রাজনৈতিক প্রভাব— সব মিলিয়ে এক অদম্য ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পুণঃনির্বাচনের আগে রাজীবের রাজনৈতিক হাওয়া বদলাতেই সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতায় এসে সরাসরি “পুষ্পাকে বুঝে নেওয়া হবে” বলে বার্তা দেন। এরপরই জাহাঙ্গীরের প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের চেষ্টা রাজনৈতিক মহলে আরও জল্পনা বাড়ায়। যদিও আইনি কাঠামোয় এভাবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ নেই, তাই প্রক্রিয়াটি কার্যকর হয়নি। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে জনতার রায়ই শেষ কথা। যে ফলতায় ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়কে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ভোটে এগিয়েছিল, সেই ফলতায় জাহাঙ্গীর মাত্র ৫৯১৪ ভোট পেয়ে জামানত হারাল। এবং চতুর্থ হল। সংখ্যার এই নাটকীয় বদলই বলে দিচ্ছে, বাংলার রাজনীতিতে জনমত কখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব। এই ফল শুধু একজন নেতার পতন নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধেও মানুষের স্পষ্ট বার্তা। বাংলার ভোট আবার প্রমাণ করল, রাজনৈতিক ‘পুষ্পা’রাও স্থায়ী নয়। ফলত পলিটিক্যালি এখানেই শেষ পুস্পা। এবার প্র্যাকটিক্যালি শেষ হবার পালা।
ফলতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতাবাসীকে অনুরোধ করেছিলেন, বিজেপি প্রাথী দেবাংশু পণ্ডাকে ১ লক্ষ ভোটে জেতান, আপাতত ভোটের ফল ১ লক্ষ ৮ হাজার ভোটে জিতেছেন তিনি। ফলতাবাসী মুখ্যমন্ত্রীর কথা রেখেছেন। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী ফলতা থেকে হংকার দিয়েছিলেন, কোথায় পুষ্পা! কোথায় পালিয়েছে? কথা দিয়ে গিয়েছিলেন, 'পুষ্পাকে আমার উপর ছাড়ুন, আমি বুঝে নেব।' এবার মুখ্যমন্ত্রীর পালা।
বাংলার রাজনীতি বহুবার দেখিয়েছে, এখানে ক্ষমতার দম্ভ খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। একসময় যাদের অজেয় মনে হয়, জনতার রায় মুহূর্তে তাদের প্রান্তে ঠেলে দিতে পারে। ফলতা সেই পুরনো সত্যিটাই আবার সামনে আনল। তাই এখন রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন একটাই— পলিটিক্যালি ‘পুষ্পা’ ইতিমধ্যেই শেষ! আর যদি জনতার রায় এত স্পষ্ট হয়, তাহলে প্রশাসনিক বা আইনি বাস্তবতায় সেই ‘পুষ্পা’র অধ্যায়ের শেষ কবে? বাংলার রাজনীতি আপাতত সেই উত্তরই খুঁজছে।