অবাক বিশ্ব। এখানে বাটোয়ারা হচ্ছে মানুষের। শুধু তাই নয় বাটোয়ারা হচ্ছে ঈশ্বরের। মুখে যতই বলি না কেন যেই রাম সেই কৃষ্ণ সেই যীশু সেই আল্লা। মন থেকে আর তা মানতে পারি কোথায়? শুধুমাত্র অজ্ঞানতা থেকে আমরা ঈশ্...
অবাক বিশ্ব। এখানে বাটোয়ারা হচ্ছে মানুষের। শুধু তাই নয় বাটোয়ারা হচ্ছে ঈশ্বরের। মুখে যতই বলি না কেন যেই রাম সেই কৃষ্ণ সেই যীশু সেই আল্লা। মন থেকে আর তা মানতে পারি কোথায়? শুধুমাত্র অজ্ঞানতা থেকে আমরা ঈশ্বর ভগবান ও দেবতাকেও এক করে ফেলি। কিন্তু সনাতন ধর্ম হিসেবে এই তিনের মধ্যে কিন্তু বিরাট পার্থক্য আছে। ঈশ্বর হলেন এক অব্যয় এবং অদ্বিতীয়। তিনি অনাদির আদি। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা। তিনি সকল জাগতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ। সকল ধর্ম, ভাষা ভেদে ঈশ্বর অনন্ত-অসীম সত্ত্বাকেই প্রকাশ করে। অন্যদিকে ভগ ও বান সন্ধির ফলে ভগবান শব্দের উদ্ভব হয়েছে। ভগ শব্দের অর্থ ঐশ্বর্য্য। বান শব্দের অর্থ অধিকারী। অর্থাৎ যিনি ঐশ্বর্যের অধিকারী তিনিই ভগবান। পরাশর মুনির কথায় যার মধ্যে সকল ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টি গুণ বর্তমান তিনিই ভগবান। সনাতন ধর্মে বহু মুনি ঋষিদের আগে ভগবান শব্দটি ব্যবহার হয়। আর প্রভু বলতে প্রদানকারীকে বোঝায়। তার মানে হল যিনি সকল ঐশ্বর্যের অধিকারী তিনি ভগবান আর যিনি প্রদান করেন অথবা রক্ষা করেন তিনি প্রভু। অর্থাৎ একটা ষাঁড়ের কাছে পালক প্রভু কারণ তিনি রক্ষাদান করেন। আর পালকের কাছে ষাঁড় ভগবান। কারণ সে ঐশ্বর্য প্রদান করেন।

অন্যদিকে দেবতা শব্দের অর্থ হল যাদের দানে আমরা পুষ্ট। মানে যে কেউ কোনও কিছুর ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব অর্জন করেছেন তিনিই দেবতা। যেমন সরস্বতী জ্ঞানের দেবতা, লক্ষ্মী সম্পদের দেবতা, দুর্গা শক্তির দেবতা, যম মৃত্যুর দেবতা। আবার শচীন তেন্দুলকার ক্রিকেটের দেবতা। কিন্তু শচীন তেন্ডুলকর কখনও ক্রিকেটের প্রভু বা ভগবান নন। কারণ তিনি ক্রিকেটকে রক্ষা করেন না। তার পরেও ক্রিকেট চলবে। শচীন ক্রিকেটের সৃষ্টি করেননি। তিনি এটা সম্পূর্ণ ভাবে আয়ত্ত্ব করেছিলেন। দেবতারা মানুষকে ভৌতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করতে পারেন, কিন্তু মুক্তি দিতে পারেন না। দেবতারা মায়াধীন কিন্তু ভগবান মায়াধীশ। দেবাতারা প্রভাবিত হন কিন্তু ভগবান নিত্য বর্তমান। আমাদের পুরাণের ৩৩ কোটি দেবদেবী সকলেই একই ঈশ্বরের এক একটি শক্তির সাকার রূপ। এখানে ৩৩ কোটি সংখ্যাটি বিব্রতকর। এখানেও রয়েছে আমাদের অজ্ঞানতা। ৩৩ প্রকার কথাটি পরিবর্তিত হয়েছে ৩৩ কোটি সংখ্যায়। ৩৩ কোটিতে রয়েছে ১২ আদিত্য, ১১ রুদ্র, ৮ বসু, ২ অশ্বিন। এখানে দেখা যাচ্ছে ভগবান উপাধির অধিকারী শুধু অবতারগণ এবং দেবতারা।

তাহলে শ্রীকৃষ্ণকে একসঙ্গে ভগবান এবং ঈশ্বর বলা হয় কেন? কারণ অন্যান্য অবতাররা হলেন বিষ্ণু বা শিবের আংশিক অবতার, কিন্তু শ্রী কৃষ্ণ ছিলেন বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার। শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে ষষ্ঠ গুণ সহ সকল গুণ ছিল। তাই তিনি একাধারে ঈশ্বর এবং ভগবান। এখানে প্রশ্ন জাগে শ্রী বিষ্ণুই যদি সকল জ্ঞানের আধার তাহলে ব্রহ্মা আর মহেশ্বরের অস্তিত্ব কোথায়? এই ধারণাই সকল জটিলতার মূল। নিরাকার ব্রক্ষ্ম যখন সৃষ্টি করেন তখন তার নাম ব্রহ্মা, যখন পালন করেন তখন তারই নাম বিষ্ণু এবং যখন ধ্বংস করেন তখন তার নাম মহেশ্বর। এই তিন আলাদা সত্ত্বা নয়। একই ঈশ্বরের আলাদা তিনটি নাম মাত্র। একজন ফসল ফলালে কৃষক, কৃষিপন্ন বিক্রি করলে দোকানী কোনও কিছু ক্রয় করলে ক্রেতা। ক্রয় করে পায়ে হেঁটে ফিরলে তাঁকে পথিক এবং জিনিশ নিয়ে ঘরে ঢুকলে গৃহস্বামী বলে। একজন মানুষের এতগুলি ভূমিকা। তেমনই নিরাকার ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে সংহার করেন।
