বাইরে থেকে দেখে মনে হবে একেবারে সাদা ফ্যাটফ্যাটে ভ্যানিলা আইসক্রিম। কিন্তু মোড়ক ছাড়ালেই ভুরভুর করবে চকলেটি-গন্ধ।
শান্তনু সেনের পোস্ট
একদা তৃণমূলের চিকিৎসক-সাংসদ শান্তনু সেন সমাজমাধ্যমে একটি ভ্যানিলা-পোস্ট করে রবিবাসরীয় সকালে শিরোনামে উঠে এলেন: স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের জন্য বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ, অভিনন্দন।
ভ্যানিলা আইসক্রিমের মোড়ক খুলতেই পর্যবেক্ষকদের নাকে এল সেই চকলেটি-গন্ধ। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে শান্তনু সেন অভিষেক-পন্থী। আরজিকর-কাণ্ডে সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় তাঁকে সাসপেন্ড করে দল। এমনকি, উত্তরবঙ্গ লবির যশস্বী চিকিৎসক সুদীপ্ত রায়ের সৌজন্যে তাঁর ডাক্তারির রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়। যদিও, কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে তিনি সসম্মানে ফিরে পান নিজের রেজিস্ট্রেশন। এমতাবস্থায়, দুয়ে-দুয়ে চার করে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ক্ষমতায় এসে ফের আরজিকর-ফাইলস খোলার জন্যই শুভেন্দুকে এত অভিনন্দন শান্তনুর। স্বাস্থ্য প্রকল্প নিমিত্তমাত্র।
শুধু কি তাই?
আরজিকর-কাণ্ডের প্রতিবাদে যখন উত্তাল গোটা বাংলা তথা দেশ-বিদেশ, রাতদখল করছে নাগরিক সমাজ, স্কুল-কলেজের প্রাক্তনীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মিছিলের ডাক দেওয়া হচ্ছে, জহর সরকারের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন, তখন প্রতিবাদীদের নিয়মিত কটাক্ষ করে গেছে তৎকালীন শাসকদলের নেতৃত্ব। সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জুনিয়র ডাক্তারদের উদ্দেশে কিঞ্চিৎ হুঁশিয়ারির সুরেই বলেছিলেন, 'অনেক তো হল,এবার উৎসবে ফিরুন'।
এমতাবস্থায়, ঘাসফুল শিবিরের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আন্দোলনকারীদের নিশানা করে একটিবারের জন্যও কু-কথা বলেননি তিনি। সূত্রের খবর, ১৪ অগস্ট রাতে যখন তথ্য-প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে আরজিকর-আক্রান্ত হয় এবং পুলিস আগেভাগেই হাত তুলে দেয়, তখন নাকি অভিষেকের ফোনেই কলকাতার তৎকালীন সিপি বিনীত গোয়েল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এমতাবস্থায়, আরজিকরের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের থ্রেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন তৃণমূলের চিকিৎসক নেতা শান্তনু সেন ও তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী। এবং দাবি করেন, সন্দীপ-অভীক-বিরূপাক্ষর মন জুগিয়ে না-চলার জন্য তাঁদের মেয়েকেও আরজিকরে মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয়।
পরিস্থিতি একটু থিতু হতেই আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের নামে এফআইআর করে থানায় ডাকার পালা শুরু হয়। রাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ প্রতিহিংসা পরায়ণ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নজির তৈরি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গ লবির রোষে পড়েন শান্তনু সেনও। শান্তনুকে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়। তারপর, রেজিস্ট্রেশন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলে।
পালাবদল
এরপর পালা গড়িয়েছে বিস্তর। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে যাবতীয় 'উৎসবে'র বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষ। নিজের গড় থেকে পরাস্ত হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেছেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই, রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত জনস্বাস্থ্যের উপর নজর দেন শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নবান্ন থেকে একগুচ্ছ কল্যাণমুখী প্রকল্পের ঘোষণা করেন তিনি। এর পর ২৪ ঘণ্টাও পেরোতে পারেনি। একদা তৃণমূলের চিকিৎসক-সাংসদ শান্তনু সেন এই স্বাস্থ্য প্রকল্পের জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আপাতভাবে এই প্রশংসা সাদা ভ্যানিলা আইসক্রিমের মতো। কিন্তু মোড়ক খুললেই সেই চকলেটি গন্ধ। আদতে, নতুন করে আরজিকর-ফাইল খোলার কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসা পঞ্চমুখ শান্তনু সেন। অন্তত তেমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।