“তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন, সে জানে তোমারে ভোলা কঠিন।”- কাজী নজরুল ইসলামের ছোট্ট এই উদ্ধৃতি-টি অল্প শব্দেই ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে। 'ভালোবাসা' বা 'সম্পর্ক', বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবের পরে নিজের,একদমই নিজের মানুষ বলতে আমরা ভালোবাসার মানুষকেই বুঝি। যার কাছে আমরা সবচেয়ে সাবলীল, যার সামনে দাঁড়ালে আমরা আমাদের ভিতরের শিশুটিকে বাইরে নিয়ে আসতে একবারও ভাবি না। চার অক্ষরের এই শব্দের কিন্তু ভার অনেক, যার সাথে জুড়ে থাকে দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান এই প্রযুক্তি ও মোবাইলের যুগে, ভালোবাসা বা সম্পর্ক বদলে ফেলেছে তার রূপ। সেই আবেগ, হারিয়ে ফেলার ভয় বা ক্ষণিক দেখা হওয়ার আনন্দ সেসব আদৌ আছে কী? যেখানে মোবাইলে ডেটিং এপ্লিকেশনের এক ক্লিকেই বদলে যায় সঙ্গী।
সম্পর্ক গভীর কিন্তু নেই কোনও দায় -এই জীবনবোধ এক অদ্ভুত মায়াবী কুয়াশার মতো। বাইরে থেকে স্বাধীন ও আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের মনস্তত্ত্বের এক জটিল জাল। কোনো অনুচ্ছেদ বা পয়েন্টের বিভাজন ছাড়াই এই ভাবনার গভীরে ডুব দিলে এক চিরন্তন সত্য উন্মোচিত হয়। মানুষের মন স্বভাবতই দ্বিমুখী। সে একদিকে যেমন একাকীত্বের ভয় থেকে বাঁচতে অন্যের নিবিড় সান্নিধ্য চায়, ঠিক অন্যদিকে নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে গুটিয়ে থাকে। যখন একটি সম্পর্কে গভীর টান তৈরি হয় কিন্তু কোনো সামাজিক বা নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকে না, তখন মনের এই দুই বিপরীতমুখী চাহিদার মধ্যে একটি সাময়িক স্বস্তিদায়ক ভারসাম্য তৈরি হয়। এই ধরণের সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায় থাকে না, নেই কোনো অধিকার খাটানোর চিরন্তন দ্বন্দ্ব। মানুষ তখন কেবল বর্তমান মুহূর্তের আনন্দটুকুকে উপভোগ করে। ফরাসি দার্শনিকদের অস্তিত্ববাদের মতই, এখানে প্রতিটি মানুষ নিজের অস্তিত্বকে স্বাধীন রেখে অন্যকে স্পর্শ করতে চায়। সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যানের ভাষায়, এটি যেন এক ধরণের তরল ভালোবাসা, যা নিজের সুবিধা মতো আকৃতি বদলাতে পারে কিন্তু কোনো স্থায়ী ছাপ রেখে যায় না।
মানুষ যখন জীবনের গতিময়তার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে এমন একটা ছায়া খোঁজে যেখানে জিরিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু সেই ছায়াকে ধরে রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই দর্শনের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দায়মুক্ত সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা আসলে মানুষের অবচেতন মনের এক ধরণের আত্মরক্ষা কৌশল বা ‘ডিফেন্স মেকানিজম’। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, অনেক সময় অতীতে পাওয়া কোনো মানসিক আঘাত, প্রত্যাখ্যানের ভয় কিংবা শৈশবের কোনো পারিবারিক অস্থিরতা থেকে মানুষের মনে ‘কমিটমেন্ট ফোবিয়া’ বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ভয় তৈরি হয়। মন তখন নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এমন এক নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করে, যেখানে ভালোবাসা পাওয়া যাবে কিন্তু আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। দায় না থাকার অর্থ হলো প্রয়োজনের মুহূর্তে সম্পর্কের সুতোটি সহজেই কেটে দেওয়া যাবে। কিন্তু এই মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সম্পর্কে সম্পূর্ণ দায়হীন থাকে, তখন অবচেতনভাবেই তার মনে এক ধরণের শূন্যতা ও গভীর নিরাপত্তাহীনতা বাসা বাঁধে। মানুষের মন আদতে এমন এক আশ্রয় খোঁজে যা চিরন্তন এবং নির্ভরযোগ্য। সাময়িক দায়হীনতা তীব্র মানসিক তৃপ্তি দিলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে ভেতরে ভেতরে একা করে তোলে। কারণ, চরম বিপদের দিনে বা বার্ধক্যের একাকীত্বে মানুষ যখন কোনো নির্ভরযোগ্য হাত খোঁজে, তখন দায়হীন সম্পর্কের আলগা সুতো অবলীলায় ফসকে যায়।
সম্পর্ক ও দায়ের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় রসদ। দায়হীন সম্পর্ক মানুষের ক্ষণিকের মানসিক ক্লান্তি দূর করার বা পরম স্বাধীনতার স্বাদ নেওয়ার চমৎকার মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ আত্মিক শান্তির স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না। প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক শান্তি আসে তখনই, যখন মানুষ স্বাধীনতার সমান্তরালে অন্য একটি মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার সাহস দেখায়। তবে দায়িত্বহীন সম্পর্ক যেমন মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এক অনিশ্চিত গন্তব্যে, তেমনই অতিরিক্ত দায়বদ্ধতাও আবার সম্পর্কের দম আটকে দেয়। তাই জীবনের শ্রেষ্ঠ দর্শন লুকিয়ে আছে এক অলিখিত ভারসাম্যে—যেখানে ভালোবাসা হবে আকাশের মতো মুক্ত, কিন্তু তার শিকড় জড়িয়ে থাকবে একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও নীরব দায়িত্বের মাটির সাথে। ভালোবাসা সংক্রামক হোক....।