মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির বন্ধুত্ব নিয়ে নতুন করে কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের মধ্যেও ভারত যে ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসেনি, সেই অবস্থানকেই এবার প্রকাশ্যে কুর্নিশ জানালেন রুশ...
মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির বন্ধুত্ব নিয়ে নতুন করে কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের মধ্যেও ভারত যে ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসেনি, সেই অবস্থানকেই এবার প্রকাশ্যে কুর্নিশ জানালেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ভালদাই ফোরাম অফ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্টসের মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূয়সী প্রশংসা করে পুতিন স্পষ্ট জানালেন, মোদী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুই নন, তিনি সেই বিরল রাষ্ট্রনেতা যিনি ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও চোখে চোখ রেখে যুদ্ধ থামানোর কথা বলেন।
পুতিনের কথায়, “নরেন্দ্র মোদী সেই সব নেতাদের মধ্যে একজন যাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভাল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তিনি বার বার ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ থামানোর কথা বলেন। সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ আছে, তাঁর চিন্তাভাবনা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষ থাকেন এবং শান্তির চেষ্টা করেন। আমরা তাঁর এই ভাবনার জন্য কৃতজ্ঞ।” রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের অবস্থান নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়ায় জোর চর্চা চলছে।
আসলে ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভারত এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে। একদিকে রাশিয়ার থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনা বহুগুণ বাড়িয়েছে, রেকর্ড আমদানি করেছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রসংঘ থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ডাক দিয়েছে। মোদী নিজে একাধিকবার বলেছেন, “এটা যুদ্ধের যুগ নয়।” পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যেমন এই বার্তা দিয়েছেন, তেমনই কিয়েভে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করেও শান্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন। এই দ্বিমুখী কূটনীতিই ভারতকে আলাদা জায়গা দিয়েছে।
যদিও ভারতের এই তেল-নীতি ভাল চোখে দেখেনি আমেরিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ভারত রুশ তেল কিনে কার্যত যুদ্ধের জন্য মস্কোকে অর্থ জোগাচ্ছে। সেই যুক্তিতে ভারতীয় পণ্যের উপর চড়া শুল্কও চাপানো হয়। কিন্তু নয়াদিল্লি তার অবস্থান থেকে সরেনি। সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেখেই তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কোনও বাইরের চাপে নয়।
প্রসঙ্গত, এটাই প্রথম নয় যে পুতিন মোদীর প্রশংসা করলেন। এর আগেও একাধিকবার তিনি মোদীকে ‘সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন নেতা’ বলে অভিহিত করেছেন। গত বছর কাজানে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে এবং চলতি বছর দিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও পুতিন বলেছিলেন, ভারতের মতো একটি মহান দেশ নিজের বিদেশনীতি নিজেই ঠিক করে। এবার ভালদাই মঞ্চ থেকে সেই প্রশংসাই আরও একবার ফিরে এল, যা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের নিরপেক্ষ অথচ সক্রিয় শান্তি-উদ্যোগের ভূমিকাকেই মান্যতা দিল।