হাজারিবাগ থেকে রামগড় যাবার রাস্তাটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলে গিয়েছে অনেকটা। একদিকে সবুজ গুল্মের দেওয়াল পাহাড়ের গায়ে, অন্যদিকটা বেশ গভীর খাদ, সেটাও জঙ্গলে ভর্তি। এই এলাকাটায় মাওবাদীদের দাপাদাপ...
হাজারিবাগ থেকে রামগড় যাবার রাস্তাটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলে গিয়েছে অনেকটা। একদিকে সবুজ গুল্মের দেওয়াল পাহাড়ের গায়ে, অন্যদিকটা বেশ গভীর খাদ, সেটাও জঙ্গলে ভর্তি। এই এলাকাটায় মাওবাদীদের দাপাদাপি আছে যথেষ্ট। রাতের বাসগুলোতে লুটপাট চালায় দুষ্কৃতিরা, বদন হয় মাওবাদীদের। তাই মাঝে মাঝেই মাওবাদীদের সাথে দুষ্কৃতকারীদের ঝামেলা হয়, দু পক্ষের তরফেই গুলি বোমা চলে। হতাহত হয়। পুলিশ এসবের মাঝখানে যায় না। তবে দুপক্ষের মাঝখানে যদি সাধারণ মানুষ পড়ে যায়, তাহলে তারাও মারা যায়, তখনই পুলিশ ঢোকে। তদন্ত হয়, কিন্তু কিছুই হয় না।
হাজারিবাগ বাস স্ট্যাণ্ডটা এখন কেমন হয়েছে জানি না। তবে নব্বই দশকের শেষের দিকটায় জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। চারিদিকে নোংরা ছড়ানো ছেটানো। বাস স্টাণ্ডের ভিতরেই কয়েকটা অস্থায়ী খাবার দোকান, চা, পান সিগারেটের স্টল। আর বাইরে মদের কাঠের গুমটি, চাটের বিপুল আয়োজন। জামশেদপুর থেকে যখন হাজারিবাগ পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। এখানকার বাসগুলো একসময় বেশ চেকনাই ছিল বোঝা যায়। বাসের ভিতরে টিভিতে ভিডিও চলে তারস্বরে। তাতে ভোজপুরী চটুল নাচ গান। সিটের কভার ছিঁড়ে গেলেও বেশ আরামদায়ক গদী। পিছনে হেলানোও যায়। এখন সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি সময়। হাল্কা ঠান্ডা হাওয়া বাসের জানালার কাঁচ বেয়ে এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। খাদের দিকে সূর্যাস্ত নামে, সেই কমলা রঙের ছটায় পুজো পুজো গন্ধ মনে হয়। বাসের জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছি আমার বাড়ীর কথা, মায়ের কথা। মা তখন প্রায় শয্যাশায়ী। ভিতরে ভিসিআরে চলছে "তোহার পাতলি কমরিয়া", মন ভালো নেই। পেটের দায়ে হিল্লিদিল্লি ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্ত লাগে আজকাল। বাসের ভিতরে খৈনী পেটানোর শব্দ, স্থানীয় মদের গন্ধ, কেউ বিড়ি খাচ্ছে তার গন্ধ, সব মিলিয়ে নরক গুলজার। কিন্তু বাইরেটা মায়াবী। পড়ন্ত সূর্যের নরম আলো খাদের গাছ গুলো ছুঁয়ে বাসের দিকে আসছে। বাস চলার আওয়াজের মাঝেও পাখির কিচিরমিচিরের শব্দ এই বনাঞ্চল সরগরম। বাসের গতি প্রায় সত্তর আশি কিলোমিটার হবে। সাড়ে চারটে, পৌনে পাঁচটা নাগাদ বাসটা দাঁড়িয়ে গেল বুনো বাস স্টপে। আধ ঘন্টার বিরতি। সবার মত আমিও নামলাম বাস থেকে। বাথরুম সেরে এলাম একটু দূরে গিয়ে। এখানে চার খানা দোকান, তবে দোকান না বলে ঝুপড়ি বলাই ভালো। দুটো খাবার দোকান, একটা চা, পান, বিড়ির আর একটা স্থানীয় মদের। কোনোটাই ইলেক্ট্রিকের আলো নেই হ্যাজাক ঝোলানো, তবে সেগুলো বোধহয় আরও একটু সন্ধ্যে নামলে জ্বালবে। আমিও সকালে খেয়েছি সাড়ে নটায় জামশেদপুরে। তারপর সেখানে ডীলারের সাথে বেশ কিছু কাজ করে তারপর এই বাসটা ধরবার তাড়ায় আর খাওয়া দাওয়া হয় নি। খিদেটা ভালোই পেয়েছে। সামনে রুটি আলুরদম দেখে খিদেটা একটু বেশীই পেয়ে গেল। চার খানা রুটি, বিশাল ঝাল দেওয়া আলুরদম তারপর তিতকুটে চা খেয়ে তবে একটু চাঙ্গা হলাম। দিশি মদের দোকানেই যত ভীড়। ড্রাইভার, কনডাক্টর, বছর পনেরোর হেল্পারটা পর্যন্ত স্টীলের গেলাসে মদ গিলছে। ইতিমধ্যেই হ্যাজাক গুলো জ্বলে উঠেছে। সূর্য পাটে গিয়েছে। পাখির কলরব চলছে তবুও সাথে ঝিঁঝি পোকার চিল চিৎকার। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। সামনের পাহাড়টাকে অদ্ভুত সুন্দর কিন্তু ভয়ঙ্কর লাগছে। কিছুক্ষণ পরে বাস ছাড়লো বেশ কয়েকবার হর্ণ দিয়ে। আর ঘন্টা খানেকের পথ তারপরেই পৌঁছে যাবো হাজারিবাগ বাস স্ট্যাণ্ডে। ওখান থেকে রামগড় যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে। রামগড়ে এক বেলার কাজ। সেই কাজ সেরে রাতেই চলে যাবো রাঁচিতে। ওখানে দিন দুয়েকের কাজ সেরে ট্রেনে ফিরবো কলকাতায়।
—-প্রবীর বিশ্বাসের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত