ব্রাত্য বসু নিঃসন্দেহে খুব বুদ্ধিমান মানুষ। তাঁর নাটক, সিনেমা কিংবা লেখার মধ্যে স্তর আছে, ইঙ্গিত আছে, রাজনৈতিক পাঠ আছে। কিন্তু সমস্যা হল—সেই পাঠের জায়গাতেই অনেক সময় দর্শক বা পাঠক কিছুটা ‘কনফিউজড’ হয়ে যান।
কিছু বুদ্ধিজীবী তো আজও আছেন, যাঁরা ব্রাত্যকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—আসলে তিনি বলতে চানটা কী?
‘রুদ্ধসঙ্গীত’-এ যেন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, পঞ্চাশের দশক থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরে কিছু ত্রুটি, কিছু বিচ্যুতি তৈরি হতে শুরু করেছিল।
আবার ‘উইঙ্কিল টুইঙ্কিল’-এ যেন উঠে আসে অন্য এক সময়ের গল্প। সত্তরের দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলন, সেই সময়ের লড়াই—সবকিছুর মধ্যেই যেন প্রশ্ন ছোড়া হয়, সেই লড়াইয়ের সময়টা কি কোথাও গিয়ে নষ্ট হয়ে গেল? নাকি তার ভিতরের সংকট আরও পরে, এমনকি ২০০০ সালের আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল?
আর ‘হুব্বা’-য় তো আবার অন্য ছবি। সেখানে যেন দেখা যায়, আশির দশকেই এলাকায় এলাকায় রাজনীতি, ক্ষমতা, দাদাগিরি আর ব্যক্তিস্বার্থের এক অদ্ভুত মিশেল তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে কোনটা ঠিক? পঞ্চাশের দশকেই কি ত্রুটির শুরু?
rnনাকি সত্তরের লড়াইয়ের সময়টাই কোথাও হারিয়ে গেল? নাকি আশির দশকেই স্থানীয় স্তরে রাজনীতির চরিত্র বদলাতে শুরু করেছিল?
নাকি ব্রাত্য আসলে কোনও একটি সময়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন না? বরং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বিবর্তনকে আলাদা আলাদা গল্পের মধ্যে ধরে দেখছেন?
আর একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ—ব্রাত্য বসুকে সরাসরি কমিউনিস্ট-বিরোধী বলে দেখলে হয়তো তাঁর কাজের গভীরতার একটা বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। তাঁর সমালোচনার মধ্যে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনই আছে রাজনৈতিক স্মৃতি, আদর্শের টানাপোড়েন এবং সেই আদর্শের ভিতরের মানুষগুলোর প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা।
এই জায়গাতেই ফেদেরিকো ফেলিনির কথা মনে পড়ে। ফেলিনির ছবিতে সমালোচনা ছিল, কিন্তু সেই সমালোচনার ভিতরেও ছিল গভীর মানবিকতা। তিনি শুধু আঙুল তুলতেন না, চরিত্র, সময় এবং সমাজের জটিলতাকেও দেখাতেন। ব্রাত্যর কাজেও সেই গভীরতার ছাপ আছে।
তবে এখানেই একটা বড় ফারাক।
শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা মনোজ মিত্র—এঁদের কাজের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, তাঁরা যেন সমুদ্র। সেখানে শুধু সাঁতার কাটলেই হয় না; নামলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাঁদের নাটক, রাজনীতি, সমাজবোধ, দর্শন—সব মিলিয়ে পাঠের স্তর এত গভীর যে বারবার ফিরে যেতে হয়।
ব্রাত্য বসুর ক্ষেত্রেও গভীরতা আছে। কিন্তু সেই গভীরতাটা যেন অনেকটা পুকুরের মতো—জল আছে, তল আছে, সাঁতার কাটা যায়, ডুবও দেওয়া যায়; কিন্তু সেই পুকুরে নামলে ডুবে যাওয়ার ভয়টা সমুদ্রের মতো তীব্র নয়।
ফারাকটা এখানেই।
ব্রাত্যকে বুঝতে গেলে তাঁর বক্তব্যের চেয়ে তাঁর প্রশ্নগুলোকে বুঝতে হবে। তিনি কোন সময়কে সঠিক বলছেন, সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোন প্রশ্নটা আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছেন।
rnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrnrn
আর সেই প্রশ্নটাই হয়তো আজও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক—আদর্শের ভুল কোথায় হয়েছিল, সময়ের ভুল কোথায় হয়েছিল, আর মানুষ কোথায় গিয়ে সেই আদর্শ থেকে সরে গেল?