একটা সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবর্তিত হতো শিল্প বনাম কৃষিকে ঘিরে। তারপর দীর্ঘদিন রাজ্যের অর্থনীতি ঘুরেছে ভর্তুকি, অনুদান এবং সামাজিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। রাজ্যের মাথার উপর জমেছে বিপুল ঋণের বোঝা, আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই সোমবার প্রথম বাজেট পেশ করতে চলেছে বাংলার নতুন বিজেপি সরকার।
এটি শুধু একটি বাজেট নয়, বরং অর্থনৈতিক দর্শনের পরিবর্তনের ঘোষণাও হতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলির অন্যতম। নতুন সরকার দাবি করছে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সময় যেখানে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। রাজ্যের মোট ঋণও কয়েক লক্ষ কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছে। ফলে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— কীভাবে ঋণের বোঝা সামলে উন্নয়নের নতুন পথ তৈরি করা যায়।
এই কারণেই এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আর্থিক শৃঙ্খলা। অর্থাৎ, রাজস্ব বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত মিলেছে, পুজো, মেলা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারি অনুদানের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হতে পারে। একইসঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেওয়া বিভিন্ন ভাতাও বন্ধ বা পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটছে সরকার। তাদের যুক্তি, জনপ্রিয়তার রাজনীতি নয়, বরং স্থায়ী উন্নয়নই হওয়া উচিত অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তবে এই পরিবর্তন সহজ হবে না।
কারণ, রাজ্যের মোট আয়ের একটি বড় অংশ এখন শুধুমাত্র ঋণের সুদ মেটাতেই খরচ হয়ে যায়। অর্থ দফতরের হিসাব অনুযায়ী, রাজস্ব আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি ঋণের সুদ শোধে ব্যয় হয়। অর্থাৎ, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনেকটাই সীমিত। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকার কেন্দ্রের সহযোগিতার উপরও জোর দিচ্ছে। জিএসটি বকেয়া, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এবং বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। "ডবল ইঞ্জিন সরকার"— এই রাজনৈতিক স্লোগানকে অর্থনৈতিক বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে।
শুধু খরচ কমানো নয়, আয় বাড়ানোর দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে পুরনো শিল্প ভর্তুকি প্রকল্পকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার ভাবনা রয়েছে। শিল্পের জন্য জমি, ল্যান্ড ব্যাঙ্ক, দ্রুত অনুমোদন— এই সমস্ত বিষয় বাজেটে গুরুত্ব পেতে পারে। উত্তরবঙ্গের জন্যও বিশেষ পরিকল্পনা থাকতে পারে। নতুন মেডিক্যাল কলেজ, শিলিগুড়িতে সর্বভারতীয় মানের চিকিৎসা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা— এসব নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছে।
তবে সবশেষে প্রশ্ন একটাই— ঋণের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে কি সত্যিই নতুন অর্থনীতির ভিত গড়া সম্ভব? উত্তরটা সময় দেবে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, এই বাজেট শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি এক নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের পরীক্ষা। যেখানে জনপ্রিয়তার বদলে গুরুত্ব পাচ্ছে আর্থিক শৃঙ্খলা, আর অনুদানের বদলে গুরুত্ব পাচ্ছে পরিকাঠামো, শিল্প ও কর্মসংস্থান। সোমবারের বাজেট তাই শুধু অর্থমন্ত্রীর ভাষণ নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের বাংলার অর্থনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণের প্রথম বড় পদক্ষেপ।