দেশের মধ্যে দেশ। অতল জল পেরিয়ে যেখানে সচরাচর কেউ পৌঁছনর সাহস করে না। যেখানে এই সেদিন অবধিও শেষ কথা বলতেন একজনই: সম্রাট নিজে। সেখানে তাঁর দরবার বসত নিয়মিত। সেই দরবারে গিয়ে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা তাঁর নাবালিকা 'কন্যা'শ্রীর বিয়ের আর্জি জানাতেন। সম্রাট খোশ মেজাজে থাকলে সেই আর্জি মঞ্জুর হত। আর তা অগ্রাহ্য করার সাহস পেতো না পুলিস বা প্রশাসন কেউই। অভিযোগ, ২০১৯ সালে তিনজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর দেহ টুকরো-টুকরো করে কেটে ভেড়ির জলে ফেলে দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, সেই সময়ে রাজ্য পুলিসের বড় কর্তা পর্যন্ত সম্রাটের সাম্রাজ্যে অভিযান চালানোর জন্য তৈরি হন। কিন্তু, শেষ অবধি পিছিয়ে আসতে হয় তাঁকে। কথিত, রাজ্যের রেশন দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা অতি প্রভাবশালী কেউ সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। চব্বিশের জানুয়ারিতে যেখান থেকে প্রাণ হাতে করে ফিরতে হয় দেশের প্রথম সারির তদন্তকারী দল এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট বা ইডি-র তদন্তকারীদের। আর, খবর করতে যাওয়া সংবাদকর্মীদের মেরে কোমর ভেঙে দেওয়া হয়।
সম্রাটের নাম: শেখ শাহজাহান। বলাই বাহুল্য। অধুনা-বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা।
অনেক ইতিহাস পার করে সম্রাট অবশেষে কারারুদ্ধ হয়েছেন ঠিকই। কিন্তু, বাংলাদেশ থেকে আসা 'মর্জিনা আবদুল্লা'রা সেখানে সুখে শান্তিতে ঘর করছেন। এবং, 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' থেকে ভাতা, রেশন থেকে চাল-গম, 'আধার' থেকে 'ভোটার কার্ড', কোনও কিছুর অভাব নেই তাঁদের। প্রবল বিরোধিতার সত্ত্বেও রাজ্যে যখন এসআইআর অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল, তখন রহস্যময় জলপথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছলেন সিএন-এর প্রতিনিধি। খোঁজ পেলেন, 'মর্জিনা-আবদুল্লা'র।
সন্দেশখালি-২ ব্লকের ২৩৫ নম্বর বুথে এমন বেশ কয়েকজন 'অনুপ্রবেশকারী'র সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাঁরা বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন। আর, তাঁদের নিয়ে স্থানীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যেও ক্ষোভ থাকলে কী হবে, সম্রাটের সাম্রাজ্যে টুঁ-শব্দটি করার জো নেই। আর সেই কারণেই, সংবাদমাধ্যমের ক্যমেরার সামনেও অকুতোভয় 'মর্জিনা-আবদুল্লা'রা।
মর্জিনা বিবি স্বীকার করে নিলেন, "বাংলাদেশ থেকে এসেছি। দশ পনেরো বছর আগে। লক্ষ্মীর ভান্ডার পাই। ভোটার কার্ড আছে। আধার কার্ডও আছে। আমাদের সবরকম সাহায্য করেছে এখানকার দল"।
খানিকদূর এগিয়ে খোঁজ পাওয়া গেল বৃদ্ধ গফুর গাজীর। তাঁকে অবশ্য দৃশ্যতই অসহায় লাগল। বললেন, "না রে বাপ, আমার কাছে কিছু (ভোটার বা আধার কার্ড) নেই। ওই কন্ট্রোলের (রেশনের) চাল আর আটা পাই। আর কিছু না"।
সিএন-এর প্রতিনিধিকে দেখে সাহস পেয়ে এগিয়ে এলেন স্থানীয়রা। গোপাল মণ্ডল অভিযোগ করলেন, "শাহজাহানের সময়ে ওরা সব এসেছিল। অনেকেই। সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। ভোটার তালিকায় নামও আছে"।
ভোটার তালিকায় জ্বলজ্বল করছে: মর্জিনা বিবি, পিতার নাম: নুর আলি গাজি, বাড়ির নম্বর: এন ০০৮৮ বয়স: ৪৭ লিঙ্গ: মহিলা।
অবৈধভাবে আসা বাংলাদেশিদের কেন গণনা ফর্ম বিলি করা হচ্ছে? বিএলও কিশোরী মোহন জোয়ারদার বললেন, "এমন দু-একজন কেউ থাকতে পারেন। তবে, আমরা তাঁদের হাতেই ফর্ম দিচ্ছি, যাঁদের নাম ২০২৫-এর ভোটার তালিকায় রয়েছে। এটাই কমিশনের নির্দেশ"।
বিএলও অবশ্য ভুল কিছু বলেননি। এটাই কমিশনের নির্দেশ। তবে, ফর্ম ভরে যখন তা বিএলও-র হাতে তুলে দেওয়া হবে, কমিশন নিযুক্ত আধিকারিক বা কর্মী হিসেবে তখন তা খতিয়ে দেখাই তাঁর আসল কাজ। কে কতদিন ধরে এখানে রয়েছেন, নতুন কে-কে এসেছেন, কার কাছে কী নথি রয়েছে, আধার-ভোটার থাকলেও তা পেতে শ্বশুরকে স্বামী হিসেবে দেখানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিএলও-র 'খতিয়ে দেখা'র উপরই কিন্তু নির্ভর করবে ভোটার তালিকায় তাঁর নাম থাকবে কি না।
প্রশ্ন একটাই, সম্রাট এখন সাম্রাজ্যে নেই ঠিকই, কিন্তু, ভেড়ির জলের আতঙ্ক অতিক্রম করে সন্দেশখালিতে দাঁড়িয়ে কাউকে অবৈধ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করবেন কে? বিএলও? তাঁর ঘাড়ে তো একটাই মাথা, তাই না?