বিহারে এসআইআর-কে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে-যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, এবার কি কলকাতা হাইকোর্টকেও তা শুরু হবে?
বাংলায় যখন এসআইআর প্রক্রিয়া সদ্য শুরু হয়েছে, তখন কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করলেন সিপিআই(এম) নেতা ও আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। টিম বিকাশরঞ্জন-এর অন্যতম মুখ জানিয়ে দিলেন, "সুপ্রিম'-পথেই লড়াই চলবে হাইকোর্টে"।
কী বক্তব্য সব্যসাচীর?
আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সব্যসাচী বললেন, "জনপ্রতিনিধিত্ব আইন নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী অভিযান করার অধিকার দিয়েছে ঠিকই। তবে, ২৩ বছর কেন এসআইআর, তা নিয়ে ঝেড়ে কাশেনি কমিশন। এমতাবস্থায়, রাজ্যে শাসক ও বিরোধী দল, যে যার মতো করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে। বিরোধী দল বিজেপি দাবি করছে, 'অনু্প্রবেশকারী' বাংলাদেশি রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে যাতে বাদ যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এসআইআর। অন্যদিকে, রাজ্যের শাসকদলের অভিযোগ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতেই এসআইআর। যদিও, পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন কিন্তু কোথাও দাবি করেনি যে, 'অনু্প্রবেশকারী'দের নাম বাদ দিতেই এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে"
এমতাবস্থায়, রাজ্যে এসআইআর-এনআরসি 'আতঙ্কে'ই দুজন আত্মঘাতী হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও একজন। তাই, কেন এসআইআর, তার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে এগিয়ে আসতে হবে নির্বাচন কমিশনকেই, দাবি করলেন মামলাকারী আইনজীবী। এবং, আদালতের নজরদারিতে যাতে এসআইআর হয়, সেই আর্জিও রাখলেন। ২০০২-এর ভোটার তালিকার ভিত্তিতে কেন এসআইআর, তা নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। বাংলায় তড়িঘড়ি করে এসআইআর চললে, বৈধ ভোটারের নাম বাদ যেতে পারে এবং মৃত-ভোটারের নাম থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করে এক সময়সীমা বাড়ানোর কথাও শোনা গেল। শুক্রবার এই মামলার অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের বেঞ্চ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, হাইকোর্টে বাম-আইনজীবীদের এই মামলা একবার শুরু হলে, একের-পর-এক ত্রুটি-বিচ্যুতি সামনে আসবে। বিভিন্ন পক্ষ এই মামলায় অংশ নেবে। এমনকি, বকলমায় তৃণমূলও এই মামলায় যুক্ত হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সবমিলিয়ে, ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া আদৌ সম্পূর্ণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন পর্যবেক্ষকরা।
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের নির্ভুল সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিয়ে বাম-আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় যে-আর্জি জানিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টা আগে তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষের বক্তব্যের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। বৃহস্পতিবার তৃণমূলভবন থেকে সাংবাদিক বৈঠক থেকে কুণাল ঘোষের মুখে শোনা যায়, 'চুপিচুপি কারচুপি'। একেবারে হাতেগরম প্রমাণ নিয়ে কুণালের বিস্ফোরক দাবি, ২০০২ সালের যে-ভোটার তালিকাকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ধরছে কমিশন, তার হার্ড কপিতে (প্রিন্ট আউট) যাঁদের নাম রয়েছে, সফট কপিতে (ওয়েবসাইটে আপলোড করা) তাঁদের নাম নেই!
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যে-মামলা শুরু হয়েছে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে, তা কিন্তু এখনও বিচারাধীন। এই মামলা চলাকালীন একের-পর-এক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে কমিশনকে। অন্যদিকে, কমিশনের তরফে হলফনামা দিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সংবিধান প্রদত্ত আইন নির্বাচন কমিশনকে যে-ক্ষমতা দিয়েছে, তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না শীর্ষ আদালত। দেশের অন্যতম দুই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের 'দ্বৈরথ' প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও, শেষ অবধি, নির্বাচন কমিশনের উপর 'ভরসা' রেখে, বিহারে এসআইআর সম্পূর্ণ করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করায় আর বাদ সাধেনি সুপ্রিম কোর্ট। এই পরিস্থিতিতে, কলকাতা হাইকোর্টের এজলাসেও কি একইরকম 'দ্বৈরথ' দেখা যাবে, প্রশ্ন আইনজ্ঞ মহলের।