সুমেধা ব্যানার্জী, নাম করা আইটি সেক্টর কোম্পানির উচ্চপদে কর্মরতা। নিউটাউনে দু কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন একা। সারাদিন অফিস,কাজের মধ্যে কেটে যায় একরকম। কিন্তু বাড়ি ফিরলেই ঘিরে ধরে একরাশ একাকিত্ব। এমন নয় যে বন্ধু-বান্ধব নেই সুমেধার, কিন্তু একটা সময়ের পরে নিজেকে সব কিছুর থেকেই দূরে রাখতেই সে ভালোবাসে। বাড়ি ফিরে, এক কাপ কফি হাতে সে ব্যালকনি থেকে হারিয়ে যায় দূরে ওই শহরের উঁচু বিল্ডিং গুলোতে। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে মেগাসিটিগুলো যেন এক একটি জীবন্ত জগত। কোটি মানুষের পদচারণা, নিয়ন আলোর ঝলকানি, আর ২৪ ঘণ্টা সচল থাকা ব্যস্ত জীবনের গল্পই এখানে প্রতিদিন লেখা হয়। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। বাইরে হাজারো মানুষের কোলাহল, অথচ মানুষের অন্তরে এক চরম শূন্যতা। এটিই আধুনিক শহরের অন্যতম বড় সংকট—ভিড়ের মাঝেও একাকীত্ব এবং তীব্র সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
মজার কথা এখানে মানুষ কখনো একা থাকে না—বাসে, ট্রেনে, রাস্তায় কিংবা বহুতল ভবনে সবসময়ই মানুষের মেলা। অথচ, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মাঝে থেকেও একজন ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারেন। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন 'crowded loneliness'। এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষের সাথে আমাদের চোখাচোখি হয়, কিন্তু কারো সাথে আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয় না। পাশের মানুষটিকে প্রতিদিন দেখলেও সে যেন এক অচেনা দ্বীপের বাসিন্দা। এই একাকীত্বের পেছনে রয়েছে মেগাসিটির ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা তীব্র ব্যস্ত জীবন। অফিস, দীর্ঘ যানজট আর দৈনন্দিন ইঁদুর-দৌড়ে মানুষের নিজের জন্যই সময় থাকে না। ফলে অন্যের খোঁজ নেওয়ার বা একটু আড্ডা দেওয়ার ফুরসত মেলা ভার। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার। স্মার্টফোন আমাদের দূরকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষকে করে দিয়েছে শত যোজন দূর। মানুষ এখন বাসে বা রেস্তোরাঁয় পাশের সহযাত্রীর সাথে কথা না বলে ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল 'লাইক-কমেন্ট' কখনো বাস্তব জীবনের উষ্ণ বন্ধুত্বের বিকল্প হতে পারে না।
শহরের আবাসন ব্যবস্থাও এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রামীণ বা মফস্বল জীবনের মতো শহরের ফ্ল্যাট কালচারে, প্রতিবেশীদের মধ্যে চেনা-জানা থাকে না বললেই চলে। পাশের ফ্ল্যাটে কে আছেন, কার সুখ বা কী অসুখ, তা বছরের পর বছর ধরে অজানা থেকে যায়। বহুতল ভবনের শক্ত দরজাগুলো যেন মানুষের মনের মাঝেও এক একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। আবার কাজের খোঁজে প্রতিদিন যে হাজারো মানুষ গ্রাম বা ছোট শহর ছেড়ে মেগাসিটিতে আসেন, তারা চেনা পরিবেশ ও পরিবার হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক সংস্কৃতিতে খাপ খাওয়াতে গিয়ে তীব্র একাকীত্বে ভোগেন। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কেবল একটি মানসিক অনুভূতি নয়, এটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘদিনের একাকীত্ব মানুষকে বিষণ্নতা, অবসাদ এবং তীব্র উদ্বেগের দিকে ঠেলে দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে এটি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। এই যান্ত্রিকতা থেকে বের হয়ে আসার দায়িত্ব ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়েরই। মেগাসিটিকে যদি সত্যিই বাসযোগ্য করে তুলতে হয়, তবে শুধু বহুতল ভবন আর ফ্লাইওভার বানালেই চলবে না। শহরের প্রতিটি এলাকায় পার্ক, খেলার মাঠ বা লাইব্রেরির মতো উন্মুক্ত স্থান বাড়াতে হবে, যেখানে মানুষ সহজে সবার সাথে মিশতে পারে। আমাদের নিজেদেরও প্রতিদিনের ডিজিটাল জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে পরিবার, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি কথা বলা উচিত। কংক্রিটের এই অরণ্যে মানুষের সাথে মানুষের সংযোগের সেতুগুলোকে আবার নতুন করে গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।