গান শুনতে ভালোবাসে না এমন ব্যক্তি বোধহয় কমই আছেন। ছোটো থেকে বড়, সবাই নিজেদের অজান্তেই কখনও না কখনও গুন গুন করেই ওঠে। মন খারাপ হলে, গান শুনলে মন একটু হলেও ভালো হয়ে যায়। মন ভালো রাখতে, কাজের প্রেরণা পেতে, গান আমাদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাজের উৎসাহ পাওয়ার জন্য প্রাচীনকালে মাঝি মোল্লারা গান করে থাকতেন, সেই গানকে বলা হয় ‘ভাটিয়ালি’। আসুন এই ‘ভাটিয়ালি’ গানের ইতিহাসে একটু নজর রাখি...
গানের অনেক ধরন আছে, তারই মধ্যে একটি ধরন হল ‘ভাটিয়ালি’। ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটির অর্থ হল নিম্নস্রোতে ভেসে যাওয়া গান। ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটি নদীর সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ এবং ভারতের জনপ্রিয় গান। ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে এই গানের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। এই গান গুলি রচিত হয়, মূলতঃ মাঝি, নৌকা, দাড় ইত্যাদি বিষয় বস্তুর উপর। পাশাপাশি, গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, গ্রাম্য নারীর প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, আকুলতা ইত্যাদি এই সমস্তও থাকে, এই গানের রচনায়।
নদীর সাথে মাঝিদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। নৌকার মাঝি বা নদীর পাড়ে জনজীবনে এই গানের প্রচলন আছে অত্যাধিক। নদীর স্রোতের মতো জীবন বয়ে চলার এক মিল রয়েছে। স্রোত সমুদ্রের দিকে চলেছে, সে কখনও থামার নয়, তেমনি জীবন প্রবহমান, যা পেরিয়ে যায়, সেটা আর ফিরে আসে না। বাংলার এক ভাটিয়ালি গানে কবি লিখেছিলেন,
“তরী ভাট্যায় পথ আর উজান না
মন মাঝি তোর বৈঠা নে’রে
আমি আর বাইতে পারলাম না।”
আধুনিক ভাটিয়ালি লোকসঙ্গীতে, আগের মতো জনপ্রিয়তা এখনও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এখন গানগুলি অনেকটা বস্তুমুখী চেতনার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়। ভাটিয়ালি গান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সাথেও জড়িত। বাংলার দ্বিতীয় প্রাচীন পুঁথি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যেও ভাটিয়ালি গানের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভাটিয়ালির জনপ্রিয় গীতিকার এবং রচিয়াতারা হলেন, কবি নারায়ণ পন্ডিত, মিরাজ আলী, শাহ আবদুল করিম,উমেদ আলি প্রমূখ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই সমস্ত ব্যক্তিরা ভাটিয়ালি গান করে থাকেন। বাংলার শিল্প সংস্কৃতির এক নির্দশন আজও বিদ্যমান রয়েছে, আজকের ভাটিয়ালি রচিয়াতাদের মাধ্যমে।