Calcutta Television Network

রাঢ় মাটির সোঁদা গন্ধ আর মাদলের বোল:ঝুমুর গানের অন্তর্যাত্রা

রাঢ় মাটির সোঁদা গন্ধ আর মাদলের বোল:ঝুমুর গানের অন্তর্যাত্রা

12 August 2026 , 06:14:41 pm

লাল মাটির পথ,শাল-পলাশের জঙ্গল আর মহুয়ার গন্ধ মিলিয়ে রাঢ় বাংলার নিজস্ব চরিত্র আছে। বীরভূম,বাঁকুড়া,পুরুলিয়া,পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান,পশ্চিম মেদিনীপুর,ঝাড়খন্ড আর উড়িষ্যা অঞ্চলের রুক্ষতাকে ছাপিয়ে ভেসে আসে এক আদিম ও অকৃত্রিম সুর। ঝুমুর,এই এলাকার বিশেষ এক জনজাতির প্রাণের সংস্কৃতি,সুখে-দুঃখে,বিরহ-প্রেমে বা উৎসবের ভাষা। ঝুমুর গানের ব্যাপ্তি বিশাল। এই গানের মধ্যে আছে লৌকিক ঝুমুর,পৌরাণিক ঝুমুর,দাঁইড়শালিয়া ধারা,পাতাশালিয়া ধারা,গাহা ঝুমুর, বৈঠকী ঝুমুর, দরবারী ঝুমুর,ভাদরীয়া ঝুমুর এবং আরো অনেক অনেক রূপ। এই গানের নামকরণ নিয়ে অনেকে বলেন,ঝুমুর (নূপুর) এর সাথে সম্পর্ক আছে বলে এর নাম ঝুমুর" আবার অনেকে বলেন "ঝুমরি রাগের বা সুরে পরিবেশিত হওয়ায় এর নাম ঝুমুর। 

ঝুমুর গানের উৎপত্তি জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে প্রায় ৬০-৭৫ হাজার বছর পূর্বের ভারতবর্ষে। ১ লক্ষ ২৫ হাজার বছর থেকে ৬০ হাজার বছরের ভিতর আফ্রিকার ইথিওপিয়া থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স এর একটি দল ভারত এবং ইউরোপে প্রবেশ করে,তারা ছিল নেগ্রিটো। যদিও নেগ্রিটোরা কৃষিকাজ বা সংস্কৃতিকেও খুব একটা বিকশিত করতে পারেনি,ফলে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে যায় ওরা। তবে আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপূঞ্জে এখনো এদের ১২টি জাতিগোষ্ঠী আলাদাভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। নেগ্রিটোদের কিছু পরে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলো প্রোটো অস্ট্রালয়েডরা। এরাও আফ্রিকার সদস্য এবং সাগর পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে প্রবেশ করায় এদের নাম হলো প্রোটো অস্ট্রালয়েড। প্রোটো অস্ট্রালয়েডদের আগমণে নেগ্রিটোরা একেবারেই অপ্রধান হয়ে পরে। এর পরে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে। অবশ্য এর মাঝে দ্রাবিড় এবং মংগোলীয় সভ্যতারও বিকাশ ঘটেছিল। আর্যরা প্রবেশের পুর্বেই দ্রাবিড়ীয় এবং প্রোটো অস্ট্রালয়েডদের ভাষার সংমিশ্রন ঘটে এবং এর ফলে আমরা তিনটি ধারা পাই, উত্তর দ্রাবিড়ীয়,অস্ট্রিক ও প্রাকৃত ভাষা। এই তিন ধারার ভাষার ব্যবহার দেখা যায় ওঁরাও,সাঁওতাল এবং মুন্ডা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঝুমুর গানের প্রচলন করেন এই জনগোষ্ঠী। 

৫০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি লোকসংগীতের একটি ধারা হিসেবে ঝুমুর গানের বিকাশ ঘটে।  ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি ভারতবর্ষ আক্রমণ করলে বাংলার সাহিত্যজগতে আসে অন্ধকার যুগ এবং এই সময় অনেক অন্ত্যজ হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। নব্য মুসলিমদের মধ্যেও ছিলো ঝুমুর গানের চল। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া অঞ্চলে মুসলমান সমাজে বিয়ের গীত হিসেবে বিশেষ ধরনের ঝুমুরের প্রচলন আছে। ঝুমুর গানের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে খুব একটা তথ্য পাওয়া যায় না,তবে সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের মতে এই গান প্রায় হাজার বছর ধরে চলে আসছে। তার মতে ঝুমুরের সঙ্গে কীর্তন মিশে পরবর্তীকালে যাত্রার উদ্ভব ঘটেছে। 

১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সাহিত্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ভক্তি আন্দোলনের হাত ধরে বঙ্গদেশে প্রসার ঘটে বৈষ্ণব পদাবলী ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের। গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং বিদ্যাপতির রচনার মধ্য দিয়ে কীর্তন-সাহিত্য এবং কীর্তন-গানের আদিপর্বের সূচনা হয়েছিল। চৈতন্য পরবর্তী যুগে এই ধারা বাংলা লোকসঙ্গীতের ঝুমুর গানে নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার ক্ষেত্র রচনা করেছিল এবং শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, ঝুমুরের বিষয়বস্তু ও সুরে ব্যাপক অদবদল ঘটায়,শুরু হয় ঝুমুর গানের মধ্যযুগ। এই গানের মধ্য দিয়ে বাংলার প্রকতি, বাংলার মানুষের দৈনন্দিন কাজ, এবং ধর্মকে ফুটিয়ে তোলা হয় এই সময়। এছাড়াও এই গানের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে রাধা-কৃষ্ণের মিলন ও বিরহ,সমাজ ব্যবস্থা,দৈনন্দিন অভাব-অনটন,খড়া-বন্যা,সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ,তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য ঝুমুর গানের রচনা হয়েছে।

রাঢ় বাংলা ছাড়িয়ে ঝুমুর গান আজ পাড়ি জমিয়েছে পশ্চিমা দেশ গুলোতে। সরকারি সাহায্য ও বেশ কিছু এনজিও ঝুমুর শিল্প-কে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। আধুনিক ব্যান্ড বা ফিউশন কালচার তাদের কাজের মধ্যে দিয়ে ঝুমুর গানকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছে। ঝুমুর কেবল বিনোদন নয়,বাংলার লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য,রাঢ় বাংলার ছন্দময় দলিল। 


0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN