মণি ভট্টাচার্য: আজ আমাদের বড় দুঃখের দিন, আমরা যারা পাহাড় চড়ি, জীবনে পাহাড়কে আঁকড়ে বাঁচতে শিখেছি, যারা অন্তত পাহাড়ের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি ধ্বংসাত্মক রূপে দেখেছি। বিশ্বের ৮হাজারী শৃঙ্গের সংখ্যা ১৪টি, এই শৃঙ্গ গুলো দেখে যখন মনে শিহরন হয় ঠিক তখন কোনও এক জায়গায় বরফ ধসে নিখোঁজ ' নিমস দাই ' বা নির্মল পূর্জা, যাকে বর্তমান সময়ে ' দ্যা গডস অফ পিকস ' বলা হত। পাহাড় যেমন সুন্দর, মনোরম, আমাদের শব্দে পাহাড়ে গেলে মানুষ ভালো হয়ে যায়, ঠিক তেমন ভাবে আমরা জানি বিপদে পড়লে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শৃঙ্গকে যেন মনে হয়, তারা যেন অপেক্ষা করছে কবে নিস্তব্দ মৃত্যু হবে আমাদের। ঠিক এই ভাবেই কোথাও বরফ ধসের মধ্যে আটকে দূরের শৃঙ্গ কে ভয় পাচ্ছেন হয়ত ' দ্যা গডস অফ পিকস ' নির্মল পূর্জা।

বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী তথা প্রাক্তন ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্সেস সদস্য নির্মল পুরজা সহ অন্তত ১০ জন পর্বতারোহী নিখোঁজ হয়েছেন। পাকিস্তানের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্বত 'ব্রড পিক'-এ একটি আচমকা তুষারধস আঘাত হানার পর থেকেই তাঁদের কোনও খোঁজ মিলছে না, যদিও এখনও অবধি উদ্ধার কাজ চালিয়ে ৪ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর। যদিও তাদের মধ্যে ২ জনকে সনাক্ত করা হয়েছে, অন্ধিরা আহমেদ আব্দুল্লা(ওমান) ও পুর বাহাদুর গুরুং যুক্তা (নেপাল) ।
সূত্রের খবর, নির্মল "নিমস" পুরজা এবং তাঁর আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী দল পাকিস্তানের ব্রড পিকে চড়ছিলেন, গতকাল অর্থাৎ ৩০শে জুলাই, সকাল ৯টা ২০ মিনিট থেকে দুপুরের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে হঠাৎ তুষারধস হয়, নির্মলের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের দলটি বুধবার 'ক্যাম্প ২'-এ পৌঁছায় এবং সেখান থেকে 'ক্যাম্প ৩'-এর দিকে ওঠার সময় এই বিপর্যয় ঘটে। তাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ছিল শুক্রবার ব্রড পিক জয় করবে। ট্র্যাকার ডেটা থেকে দেখা যায়, দলটি যখন প্রায় ৬,৬০০ মিটার (২১,৬৫৩ ফুট) উচ্চতায় একটি ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল বেয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপরের দিক থেকে একটি বিশাল তুষারধস নেমে আসে। ট্র্যাকারের সংকেতে একটি তুষারধসের খাদ বা 'গালি'-র (gully) দিকে তাদের হঠাৎ ও দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে; এরপরই তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজদের মধ্যে নির্মল পূর্জার ট্র্যাকিং ডিভাইস থেকে তুষারধসের পরেও কিছু সিগন্যাল বা নড়াচড়া দেখা গেছে, যা উদ্ধারকারীদের মনে ক্ষীণ আশার আলো জাগিয়ে রেখেছে। ১০ সদস্যের এই আন্তর্জাতিক দলে নির্মল পূর্জা ছাড়া আরও ৫ জন নেপালি শেরপা, এবং পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন ও ওমানের ১ জন করে পর্বতারোহী ছিলেন।
এই নির্মল পূর্জাকে এমনি এমনি দ্যা গডস অফ পিকস ' বলা হত না, এই নির্মলের ঝুলিতে ছিল দ্রুততম সময়ে ১৪টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের রেকর্ড। ২০১৯ সালে তিনি বিশ্বের সবকটি ১৪টি "এইট-থাউজ্যান্ডার" (৮,০০০ মিটারের বেশি উঁচু পর্বত) মাত্র ৬ মাস ৬ দিনে আরোহণ করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এর আগে পোলিশ পর্বতারোহী জের্জি কুকুচকার, যিনি এই কীর্তি গড়তে প্রায় ৭ বছর ১১ মাস সময় নিয়েছিলেন।

এই নির্মলের ঝুলিতে রয়েছে প্রথম শীতকালীন কে-টু (K2) জয়ের রেকর্ড, ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি নির্মল পুর্জা এবং তার ১০ সদস্যের অল-নেপালি শেরপা দল মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীতকালে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ কে-টু (K2) জয় করেন। শীতকালে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এটিকে পর্বতারোহণের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ মনে করা হত। এছাড়াও রয়েছে দ্রুততম ট্রিপল-হেডার অর্থাৎ এভারেস্ট, লোতসে ও মাকালু জয়ের রেকর্ড, তিনি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট, চতুর্থ সর্বোচ্চ লোতসে এবং পঞ্চম সর্বোচ্চ মাকালু পর্বত জয় করার অনন্য রেকর্ড গড়েন। রয়েছে অক্সিজেন ছাড়া দ্রুততম আরোহণ রেকর্ড, কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে মাউন্ট এভারেস্ট এবং লোতসে পর্বত আরোহণেরও রেকর্ড রয়েছে তার ঝুলিতে। এছাড়া তিনি ৮,০০০ মিটারের ওপরের শৃঙ্গগুলোতে সবচেয়ে বেশিবার আরোহণের অনন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেরও মালিক। :নির্মল পুর্জার এই অবিশ্বাস্য পর্বত জয়ের রোমাঞ্চকর যাত্রা নিয়ে নেটফ্লিক্সে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ডকুমেন্টারিও রয়েছে, যার নাম "14 Peaks: Nothing Is Impossible"।

একজন শেরপা, একজন গাইড পাহাড় চড়ার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্তপূর্ণ সেটা আমরা জানি, কিন্তু এই নির্মলের মত গাইড যে কিনা এত গুলো রেকর্ডের মালিক, যার কাছে দুর্গম পাহাড় চড়া একটা নেশা, তাদের জীবনে এরকম ঘটনা ঘটে, বরাত জোরে কয়েকজন বেঁচেও যান, অনেকে এরকম মৃত্যু স্বপ্নে দেখেন, নির্মলের কাছে এরকম ঘটনা স্বপ্ন ছিল কিনা জানা নেই তবে নির্মল পূর্জার ট্র্যাকিং ডিভাইস সামান্য নাড়াচড়া হয়েছে, সেই আশা থেকেই লিখতে পারি আবার হয়ত একটা অবিশ্বাস্য কিছু করে বীরের মত ফিরবেন ' নিমস দাই ', এই গল্প বুকে নিয়ে আমরাও ফের পাড়ি দেব দুর্গম পাহাড়। এটুকুই অপেক্ষা।