মণি ভট্টাচার্য: কখনও বৃদ্ধার চোখের জল মুছে দিচ্ছেন, কিংবা পুলিশদের সঙ্গে, একরত্তিদের সামনে পাত পেড়ে বসে পড়ছেন খেতে, কিংবা কখনও কোনও এক সরকারি অফিসে ঢুকে ছানবীন চালিয়ে কর্মীদের থেকে শুনে নিচ্ছেন কি কমতি আছে, তাঁরা গ্র্যাচুরিটি পাচ্ছেন কিনা ! সঠিক বলুন তো এমন মুখ্যমন্ত্রীই তো আমরা চেয়েছিলাম।
রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কৃতিও বদলাতে পারে, এমন দাবি অনেকেই করেন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের বাস্তব ছবি সাধারণ মানুষের সামনে কতটা ধরা পড়ে, সেটাই আসল প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে এখন সেই আলোচনাই জোরদার হয়েছে। সরকারি বৈঠকের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া, অভিযোগ শুনেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি কর্মীদের কাজের পরিবেশ খতিয়ে দেখা কিংবা বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলি প্রশাসনের এক নতুন কর্মসংস্কৃতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাগুলির একটি ঘটেছিল সফর ফেরার পথে। মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দুই যুবক চিৎকার করে অভিযোগ জানান, এলাকায় অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী কনভয় থামান, অভিযোগ শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ওই এলাকায় পুলিশি অভিযানও চালানো হয়। এই ঘটনায় অনেকেরই বক্তব্য, অভিযোগ জানানোর জন্য সাধারণ মানুষের আর শুধু দপ্তরের দরজায় ঘুরতে হচ্ছে না; সরাসরি প্রশাসনের শীর্ষস্তরও তাদের কথা শুনছে।
শুধু আইন-শৃঙ্খলা নয়, মানবিকতার ক্ষেত্রেও একাধিক নজির তৈরি হয়েছে। মুর্শিদাবাদের ট্রেন দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো এক মায়ের পাশে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নেওয়া, আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া, এই ঘটনাও মানুষের নজর কেড়েছে। প্রশাসনিক ভাষার বাইরে গিয়ে একজন শোকাহত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ছবি সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর আকস্মিক সফরও এখন আলোচনার বিষয়। বনদপ্তরের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখেননি। বরং আধিকারিকদের সরাসরি প্রশ্ন করেছেন, "কী সমস্যা? কোথায় ঘাটতি? কী লাগবে?" কর্মীদের কাছ থেকে বাস্তব সমস্যা শুনে দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রশাসনের নিচুতলার কর্মীদের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
একই ছবি দেখা গিয়েছে পুলিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রেও। প্রচণ্ড রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিউটি করা ট্রাফিক পুলিশ ও হোমগার্ডদের কষ্ট দেখে তাঁদের হাতে ছাতা, জুতো এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, তাঁদের সঙ্গে বসে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনও করেন। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তির এই আচরণ অনেকের কাছেই কর্মীদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সাজ দমকল দপ্তরেও তাঁর আকস্মিক সফর একই বার্তা বহন করে। সেখানে তিনি শুধু পরিদর্শন করেই থেমে থাকেননি। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, গ্র্যাচুইটির টাকা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না, কাজের ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা রয়েছে কি না, সরঞ্জামের ঘাটতি আছে কি না। সমস্যার কথা শুনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে রিপোর্টের বদলে সরাসরি কর্মীদের কাছ থেকেই বাস্তব চিত্র জানতে চেয়েছেন তিনি।
কখনও তিনি সাংবাদিকরা আহত হলে পৌঁছে যাচ্ছেন হাসপাতালে, দেখভাল করছেন, খোঁজ নিচ্ছেন, কিংবা কখনও সিকিমে টানেল ধসে মৃতদের পরিবারের ছোট্ট শিশুকে কোলে তুলে আদর করছেন , এতেই ক্ষান্ত নন তিনি , ওই স্বজন হারা পরিবারের বৃদ্ধা মায়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছেন। এই কয়েক মাসে মুখ্যমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে, প্রশাসনকে শুধু সচিবালয়ের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠে নামানোর চেষ্টা। অভিযোগ, সমস্যা কিংবা পরিষেবার ঘাটতি, সবকিছুর ক্ষেত্রেই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাইছে সরকার। তবে এই উদ্যোগগুলির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব ফলাফলের উপর। তাৎক্ষণিক নির্দেশ বা আকস্মিক পরিদর্শন অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা দেয়, কিন্তু সেই নির্দেশ কত দ্রুত কার্যকর হচ্ছে, সাধারণ মানুষ কতটা স্থায়ী সুবিধা পাচ্ছেন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে— সেটাই আগামী দিনে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হবে।
তবুও এতটুকু বলা যায়, মাত্র তিন মাসের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক শৈলী নিয়ে জনমনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মাঠে নেমে সমস্যা শোনা, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত এই কর্মপদ্ধতি যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে এবং তার বাস্তব ফল মানুষের জীবনে পৌঁছায়, তাহলে অনেকের কাছেই এটি হতে পারে সেই প্রশাসনিক পরিবর্তনের সূচনা, যার প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল।