অস্ফুট, তবে ইঙ্গিতপূর্ণ। এবং, সোমবার মধ্যরাতে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের আবহে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিকতম এক্সপোস্টের সারমর্ম এটাই।
কী লিখেছেন অভিষেক?
একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনকে 'অ্যাটাচ' করে এক্সপোস্টে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং, তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজনৈতিক দলের সিলমোহর লাগার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সাতবছর আগে, ২০১৯ সালের ১৯ মার্চে দেশের প্রতিটা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে একটি চিঠি দেয় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। চিঠির মোদ্দা কথা ছিল, কোনও প্রার্থীর নামে কোনও ফৌজদারি মামলা চলছে কি না, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তা জানাতে হবে। এমতাবস্থায়, কেরলম (সাবেক কেরল)-এর মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ওই চিঠি 'ফরোয়ার্ড' করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে। এবং, ওই চিঠির নিচের দিকে বাঁদিকে বিজেপির প্রতীক দেওয়া সিলমোহর দেখা যায়!
প্রসঙ্গত, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের মুখে ওই চিঠি নিয়ে 'ফরোয়ার্ড' করা হয়। ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বিষয়টিকে 'ক্লারিক্যাল মিসটেক' বলে দাবি করেন।
কমিশনের চিঠি ও ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদন 'অ্যাটাচ' করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এবং, তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সুপ্রিম কোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়েও আশঙ্কা করেন। প্রসঙ্গত, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ করে যে-কমিটি, তার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও থাকতেন। কিন্তু, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার ওই কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেয়। যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিজেপি-বিরোধী দলগুলি। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাসে মামলা দায়ের অনুমতি চাওয়া হয়। বিচারপতি সূর্য কান্ত মামলাকারীদের উদ্দেশে বলেন, তিনি এই মামলা শুনলে স্বার্থের সংঘাত (CONFLICT OF INTEREST) তৈরি হবে। এবং সেই কারণে মামলাটির শুনানি হয়নি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক্সপোস্টে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে লিখেছেন, "সেদিন আর বেশি দেরি নেই, যেদিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজনৈতিক সিলমোহর দেখা যাবে"।
কী বলছেন পর্যবেক্ষকরা?
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এক্সপোস্টে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নিরপেক্ষতাও নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। পর্যবেক্ষকরা এ-ও মনে করছেন, যখন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য ও রাজ্যের শাসকদল কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আইনি লড়াই লড়ছে, তখন অভিষেক প্রকাশ্যেই আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এমতাবস্থায়, মনে করা হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সশরীরে সওয়াল করে সুপ্রিম-জয় করার পর কমিশন কিছুটা ব্যাকফুটে পড়ে ঠিকই। কিন্তু, তারপর ক্রমাগত কমিশনের বিরুদ্ধে নালিশ শুনে তিতিবিরক্ত হয় প্রধান বিচারপতির এজলাস। এবং, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির উপরই পুরো বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে রাজ্যকে ভর্ৎসনা করে বলা হয়, বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তির কাজ নিরপেক্ষতার সঙ্গে করছেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা, তাঁদের সততা নিয়ে যেন প্রশ্ন তোলা না-হয়। এমতাবস্থায়, খেলা হাতের বাইরে চলে যায়। বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৯ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি করে একটি তালিকা প্রকাশিত হয় সোমবার গভীররাতে। সূত্রের খবর, ওই ২৯ লাখের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বাদ। এমতাবস্থায়, ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর কোনও পথ নেই। ট্রাইবুনালে বিচারক হিসেবে থাকবেন কারা, তা নির্ধারিত হলেও, কোথায় কোথায় ট্রাইবুনাল চলবে, তার জন্য টেন্ডার ডেকে কমিশনকে বাড়ি ভাড়া নিতে হবে কি না, রাজ্য সরকারই তাদের বিভিন্ন দফতরকে ট্রাইবুনালের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেবে কি না, তা এখন বিশবাঁও জলে। এমতাবস্থায় ভোট কড়া নাড়ছে দরজায়। সেই কারণেই ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদতে বর্তমানকালকেই বোঝাতে চেয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্তত তেমনটাই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।