আমাদের পাওনা না-মেটালে ছাব্বিশের ভোটে আমরা পাওনা বুঝিয়ে দেবো, হুঙ্কার আশাকর্মীদের, কী বলবেন? সংবাদমাধ্যমের এই প্রশ্নের উত্তরে সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের উত্তর, "সবারই বলা উচিত,...
আমাদের পাওনা না-মেটালে ছাব্বিশের ভোটে আমরা পাওনা বুঝিয়ে দেবো, হুঙ্কার আশাকর্মীদের, কী বলবেন? সংবাদমাধ্যমের এই প্রশ্নের উত্তরে সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের উত্তর, "সবারই বলা উচিত, ছাব্বিশে হিসেব বুঝিয়ে দেবে, যাদের হিসেবে এরা বোঝায়নি"।
বৃহস্পতিবার বহরমপুরে সিপিআই(এম)-এর সভায় সংশোধিত ওয়াকফ আইন বাতিলের দাবি উঠল। যে-দাবিকে ঘিরে গত বছর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছিল হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাসের। রাজ্যে নতুন ওয়াকফ আইন চালু হতে দেবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও, একেবারে শেষ মুহূর্তে জেলা প্রশাসনের কাছে নবান্ন থেকে নির্দেশ আসে, কেন্দ্রের উমিদ পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তি নথি-সহ আপলোড করতে হবে। হাতে তখন আর সাতদিন মাত্র সময়। সুপ্রিম কোর্টে গিয়েও সুরাহা পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ তৃণমূলের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। এদিকে, ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক (বর্তমানে সাসপেন্ডেড) হুমায়ুন কবীর নিরবিচ্ছিন্নভাবে দল-বিরোধী মন্তব্য করতে থাকেন ও রেজিনগরে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কথা ঘোষণা করেন। একেবারে শেষ মুহূর্তে দল তাঁকে সাসপেন্ড করে ঠিকই, তবে ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া হুমায়ুন বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করে নিজের জনতা উন্নয়ন পার্টি তৈরি করেন।
ছাব্বিশের বিধানসভায় বাম-কংগ্রেস জোটের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম শরিক তৃণমূলকে চটিয়ে বাংলায় বামেদের সঙ্গে জোটে যাবে না কংগ্রেস। অন্যদিকে, তৃণমূল যে কংগ্রেসকে একটা আসনও ছাড়বে না, তা-ও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, অধীর চৌধুরী চাইলেও বামেদের সঙ্গে জোটে যেতে পারবেন না। উপায় তাই একটাই, অঘোষিতভাবে বামেদের সঙ্গে আসন সমঝোতা। রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছে, সে ক্ষেত্রে জেলায় বেশ কিছু আসনে বিধানসভায় কংগ্রেসের প্রার্থীকে তলে-তলে সমর্থন করতে পারে বামেরা। অন্যদিকে, কিছু আসনে এর ঠিক উল্টোটাও হতে পারে। এবং, শেষ অবধি তা যদি হয়, তাহলে সাগরদিঘি মডেলে তৃণমূলকে পরাজিত করা অনেক সহজ হবে।
২০২৩-এ সাগরদিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। দু-বছর আগে ওই বিধানসভা থেকে তৃণমূল প্রার্থী হাজার পঞ্চাশেক ভোটের জিতেছিলেন। শুধু তা-ই নয়। বাংলার উপনির্বাচনের রীতি-রেওয়াজ অনুযায়ী শাসক দলই উপনির্বাচনে জয়ী হয় সাধারণত। এই পরিস্থিতিতে, কার্যত অধীর চৌধুরী আর মহম্মদ সেলিমের উদ্যোগেই বাম-কংগ্রেস আসন সমঝোতা হয়। কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাসকে সমর্থন করে সিপিআই(এম)। এবং তারপর যা ঘঠে তাকে মিরাকেল ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
যদিও, কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হয়ে বায়রন বিশ্বাস অভিষেকের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, তাতে করে মানুষের রায় বদলে যায় না। এবং বাংলার ভোট-ভবিষ্যৎ দেখে প্রমাদ গোনে শাসকদল, বাম-কংগ্রেস একজোট হলে মুর্শিদাবাদের বহু আসনেই তৃণমূলকে পর্যুদস্ত হতে হবে। এমতাবস্থায়, চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রবল সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হয় জেলায়। অধীর চৌধুরীর দাবি, রামনবমী অবধি তাঁর জয় সুনিশ্চিত ছিল। কিন্তু রামনবমীর দিন দাঙ্গা লাগায় শাসকদল। পাল্টা সুর চড়ায় গেরুয়া শিবির। আর তারও পাল্টা শোনা যায় ভরতপুরের তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের মুখে: আমরা (মুসলিম) ৭০ শতাংশ। চাইলে ওদের (হিন্দুদের) ৩০ শতাংশকে মেরে ভাগীরথীর জলে ফেলে দিতে পারি। প্রবল ধর্মীয় মেরুকরণের মাঝে অধীর চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়ী হন তৃণমূলের ইউসুফ পাঠান।
যদিও, গত একবছরে খেলা ঘুরে গিয়েছে। ওয়াকফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইস্যুতে শাসকদলের ওপর ক্ষিপ্ত জেলার সংখ্যালঘুদের একটা বড় অংশ। এমতাবস্থায়, হুমায়ুন কবীরের জনতা উন্নয়ন পার্টি তৃণমূলের মুসলিম ভোটে অবধারিতভাবে ভাগ বসাবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এই পরিস্থিতিতে, অধীর-সেলিম রসায়ন মুর্শিদাবাদের নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।