কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কিন্তু আমাদের মত বই প্রেমীদের কাছে রয়েছে একটি চর্তুদশ পাবর্ণ। আর তা হল কলকাতা বইমেলা। প্রতি বছরের মত এইবছরও ইতিমধ্যেই মহা সমারোহের সাথে শুরু হয়েছে কলকাতা বইমেলা। ২০২৬ সােলর এই বইমেলা শুরু হয়েছে গত ২২ জানুয়ারি। এবং চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।এবারের থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা। তবে এখানে বলা ভাল যে, কলকাতা বইমেলা শুধু একটি বই কেনাবেচার স্থান নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, মনন ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক মহোৎসব। বিশ্বের বৃহত্তম গণগ্রন্থমেলা হিসেবে পরিচিত এই বইমেলার ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল এবং তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
rn১৯৭০-এর দশকের শুরুতে কলকাতার কফি হাউজে বসে এক ঝাঁক প্রকাশক আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেই সময়ে তাদের আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ ইচ্ছে হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আদলে কলকাতায় একটি বইমেলা করার। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৭৫ সালে জন্ম হয় পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের। এরপরেই ১৯৭৬ সালের ৫ মার্চ কলকাতা বইমেলার সূচনা হয় । প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। মাত্র ৩৪জন প্রকাশক ও ৫৬ টি স্টল দিয়ে শুরু হয় এই মেলার যাত্রা। সেই সময় এটি ছিল এক অভিনব উদ্যোগ, কারণ বিশ্বের অধিকাংশ বইমেলা ছিল বাণিজ্যকেন্দ্রিক, কিন্তু কলকাতা বইমেলা ছিল সম্পূর্ণভাবে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত গণমেলা। প্রথম বছরেই এই মেলা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
rnশুরুতে বইমেলার আকার ছিল ছোট, অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের সংখ্যাও সীমিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও গুরুত্ব ক্রমশ বেড়েছে। বাংলা বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য ভারতীয় ভাষা ও বিদেশি ভাষার বইও এখানে স্থান পেতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের অংশগ্রহণ বইমেলাকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
rn১৯৮০-এর দশক থেকে কলকাতা বইমেলায় থিম কান্ট্রি বা বিশেষ অতিথি দেশের ধারণা চালু হয়। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় ঘটে। সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, বই প্রকাশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে বইমেলা হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সাহিত্য উৎসব।
rnপরবর্তীকালে ভিড় ও পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে বইমেলা স্থানান্তরিত হয় সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে, বর্তমানে যা করুণাময়ী অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়। শীতকালে জানুয়ারি মাস এলেই বইমেলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন অসংখ্য পাঠক।
rnআজ কলকাতা বইমেলা কেবল একটি মেলা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মেলা বইপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।