রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃতকর্ম যেমন সুদুর প্রসারী ও বিশ্বব্যাপী, জ্ঞানের রহস্যে মোড়া। তেমনি তাঁর আদি পুরুষদের নিয়েও মানুষের
কৌতুহলের শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর কিভাবে পিরালী ব্রাহ্মণ হলেন? আজ এই নিয়েই সংক্ষিপ্ত আলেচনা করবো।
গৌড়ের রাজা হর্ষবর্ধনের ছেলে জয়ন্তের রাজত্ব কালে, কনৌজ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে বঙ্গদেশে আনা হয়। উদ্দেশ্য হিন্দু
ধর্মের পুণঃজাগরণ ও বিস্তার করা। সেই সময় ক্ষিতিশের ছেলে ভট্টনারায়ণ বঙ্গদেশে অধিষ্ঠিত হন। ভট্টনারায়ণের ছেলে দীননাথ
মহারাজা ক্ষিতিশুরের অনুগ্রহে বঙ্গদেশের বর্ধমান জেলার কুশ গ্রামের স্বত্বাধিকার পান। তখন থেকে তিনি দীননাথ কুশারী নামে
পরিচিতি লাভ করেন। সেই থেকেই কুশারী বংশের উৎপত্তি। পরবর্তি কালে এই কুশারী বংশের কিছু লোক,বর্তমান বাংলাদেশের
খুলনা জেলার ভৈরব নদীর তীরে,পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করে।
এই পিঠাভোগ গ্রামের রামগোপালের পুত্র জগন্নাথ কুশারী হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃকুলের আদি পুরুষ। সেই সময়
খুলনার শাসন বা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মোঘল প্রশাসনের মনোনিত কর্মচারী আধ্যাত্মিক সাধক \'খান জাহান আলী\'।
পীর সাহেব বা পীর আলী নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। সেই পীর সাহেবের সেরেস্থায় কাজ করতেন গোবিন্দ লাল রায় নামে
একজন ব্রাহ্মণ। \'ঘ্রাণে অর্ধেক ভোজন\' হিন্দু ধর্মের প্রচলিত প্রবাদ। মজা করে (মতান্তরে অপমান করার জন্য ) পীর সাহেব
ঢাকা দেওয়া খাবারের পাত্র দেখিয়ে বললেন - ঠাকুর মশাই ঘ্রাণ শুঁকে বলুন ওখানে কী খাবার আছে? গোবিন্দ লাল শুঁকে বললেন-
সম্ভবতঃ কোন উগ্র গন্ধযুক্ত মাংস আছে। ঠিক ধরেছেন ঠাকুর মশাই- ওখানে গো-মাংস রান্না করা আছে। ঘ্রাণে যদি অর্ধেক ভোজন
হয় তবে তো আপনি অর্ধেক গো-মাংস খেলেন। সংবাদ দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। গোবিন্দ লালকে সমাজ চ্যুত করা হল।
তখন থেকে গোবিন্দ লাল (পীর+আলী)=পীরালী ব্রাহ্মণ রূপে পরিচিত হলেন। সাধারন ব্রাহ্মণেরা পীরালী ব্রাহ্মণদের সঙ্গে
কোন শুভ কাজ করতেন না বা আত্মীয়তাও করতেন না। গোবিন্দ লাল রায়ের বংশধর হলেন শুকদেব রায়চৌধুরী। তিনি কন্য়া
দায়গ্রস্থ একজন পিতা, কোন মতেই মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না। এই জন্য তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন। যুবক জগন্নাথ কুশারী
একবার বজরায় করে নদী পথে যাত্রাকালে ঝড়ের কবলে পড়েন এবং শুকদেব রায়চৌধুরীর বাড়ীতে আশ্রয় নেন। কুমার জগন্নাথ
সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ বংশীয় তাই তাঁর কন্যার সাথে জগন্নাথের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। ঘটনাটা ষোড়শ শতাব্দীর । জগন্নাথ কুশারী ব্রাহ্মণ থেকে
হলেন পীরালী ব্রাহ্মণ। সেই ধারা বহন করে চললেন রবীন্দ্রনাথের পূর্ব-পুরুষ।
জগন্নাথ কুশারীর পঞ্চমপুরুষ পঞ্চানন কুশারী যশোরের (বর্তমান বাংলাদেশ) সমস্ত অস্থাবর স্থাবর ত্যাগ করে ভাগীরথী
তীরবর্তী বর্তমান কোলকাতার গোবিন্দপুরে বসবাস শুরু করেন। সেই সময় গোবিন্দপুরে মালো, কৈবর্ত্য, জেলে পোদ,বণিক
শ্রেণীর লোক বসবাস করতেন। এতগুলো নীচু শ্রেণীর মধ্যে পঞ্চানন কুশারীরা ছিলেন এক ঘর মাত্র ব্রাহ্মণ। ফলে ঐ অঞ্চলের
লোকেরা ভক্তিভরে পঞ্চানন কুশারীকে পঞ্চানন ঠাকুর ডাকতেন। গোবিন্দপুরের বাসিন্দা পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তি বংশধর
নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকোয় বসতি স্থাপন করেন। এখানেই জন্মগ্রহন করেন রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর