উত্তর কলকাতার এক আবাসনে থাকেন দেবপর্না ও রোহিত, সঙ্গে তাদের তিন বছরের ছেলে আর্য। তিনজনের সুখের সংসার। কিন্তু হঠাৎই দেবপর্না খেয়াল করলেন, আর্যর দৈনন্দিন জীবনে চরিত্রগত কিছু পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে সারাদিন কলকল করে কথা বলতো, সে আজকাল চুপ করে থাকে, একা একা। ও যেন নিজের একটা জগৎ তৈরী করে নিয়েছে। এছাড়াও একই ধরনের কাজ বারবার করে যাচ্ছে ও, সাথে একটা শারীরিক অস্থিরতা, মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন সাথে বিনা কারণে কান্না। দেরী না করে, ওরা আর্য-কে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে, ধরা পড়ল অটিসম। আকাশ ভেঙে পড়লো দেবপর্না-রোহিত-এর মাথায়। সামলে উঠে ওরা ঠিক করলেন, ভয় না পেয়ে এই লড়াইতে আর্য-র পাশে থাকবেন দুজন।
অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) প্রাথমিকভাবে, যোগাযোগ দক্ষতাকে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হতো। কিন্তু আরও গবেষণার পর বোঝা যায় যে, অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা যায়, তাই অটিজম ডিসঅর্ডারের সাথে “স্পেকট্রাম” শব্দটি যুক্ত করা হয়। অটিজম একটি জটিল স্নায়ুবিকাশজনিত ব্যাধি যা একজন ব্যক্তির সামাজিক আচরণ এবং যোগাযোগ দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। যদিও ASD হওয়ার কারণ এখনও সঠিক ভাবে জানা যায়নি, তবে অনেকগুলো কারণের মধ্যে অপর্যাপ্ত ডিম্বস্ফোটন, গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ অথবা ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিকিরণের সংস্পর্শ, থাইরয়েড, ডায়াবেটিস,হরমোনজনিত সমস্যা, জন্মকালীন আঘাত, শৈশবের সংক্রমণ, বা জিনগত সমস্যাকেই সাধারণত দায়ী করা হয়ে থাকে। নাম শুনেই বোঝা যায় যে এএসডি-র বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা যেতে পারে, তবে কথা বলতে না পারা এর অন্যতম সাধারণ লক্ষণ। কিছু শিশু একেবারেই কথা বলতে পারে না, আবার কিছু শিশুর ক্ষেত্রে আগে থেকে বিকশিত বাকশক্তি হ্রাস পেতে পারে। তাদের অনেকেই নিজেদের সমবয়সী শিশুদের সাথে মিশতে পছন্দ করে না। একই ধরনের কাজ বারবার করা, শারীরিক অস্থিরতা, আবেগ বুঝতে না পারা, মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন যেমন হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়া, বিনা কারণে কান্না, এগুলো অনেক অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় এমন কিছু উপসর্গ। এছাড়াও মাথা ঠোকা, মেজাজ হারানো, অন্যদের কামড়ানো বা ধাক্কা দেওয়া এবং ধ্বংসাত্মক আচরণের মতো আগ্রাসী আচরণ কয়েকজনের মধ্যে দেখা যেতে পারে। একটানা চোখে চোখ রাখা, নির্দেশ বুঝতে না পারা, গতানুগতিক আচরণ এবং স্টিমিং হলো অটিজমের সাধারণ লক্ষণ।
অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সমাজের বোঝা মনে না করে, এই শিশুদের যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও অটিস্টিক শিশুকে অনেকে পাগল, আলগা দোষ, বাবা-মায়ের অভিশাপ বা ভূত প্রেতের প্রকোপের মতো কুসংস্কারে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। আমরা সবাই যদি সচেতন থাকি, তবেই অটিজম শিশুরা ভবিষ্যতে একটি সুন্দর জীবন দেখতে পারবে। এরা পাগল বা মস্তিষ্কবিকৃত নয়, এরা প্রখর মেধার অধিকারী। বেশির ভাগ অটিস্টিক শিশুর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে, কিছু কিছু অটিস্টিক শিশু বেশ বুদ্ধিমান হয়, অনেক সময় দেখা যায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশু অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও পারদর্শী হয়ে ওঠে।
অটিস্টিক শিশুদের একটু সুন্দর, স্বাভাবিক জীবন উপহার দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে মা-বাবা,পরিবার এবং অবশ্যই সমাজের। একটি শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ গুলো প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই পরিবারের উচিত, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থেরাপি শুরু করা। এই শিশুদের বড় করতে প্রচুর ধৈর্য ও নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। বাবা-মা, ভাইবোনসহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ইতিবাচক আচরণ, শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। তবে শুধু পরিবারের চেষ্টাই যথেষ্ট নয়, আমাদের সমাজ-কেও হয়ে উঠতে হবে তাদের জন্য নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য । সমাজে এখনও অটিজম নিয়ে নানা রকম কুসংস্কার ও লোকলজ্জা কাজ করে। প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবহেলা একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পরিবারকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। সমাজের প্রথম দায়িত্ব হলো এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। স্কুলগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সাধারণ শিশুদের সাথেই এই বিশেষ শিশুরাও পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলো এমনভাবে তৈরি করা উচিত যেন তারা সহজে যাতায়াত করতে পারে। বড় হওয়ার পর, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সমাজের অন্যতম বড় দায়িত্ব, যাতে তারা কারও ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।
দেবপর্না-রোহিত এখনও আর্য কে নিয়ে লড়ে চলেছে। সাত বছরের আর্য এখন অনেক সুস্থ, পড়াশুনা, গান বিশেষ করে ছবি আঁকায় ও বিশেষ পারদর্শী। এরই মধ্যে দু-একটা প্রাইজ পেয়েও গেছে সে। দেবপর্না-রোহিত-এর মতোই, আরও অভিভাবকরা যদি প্রথম থেকে তাদের সন্তানের ঢাল হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজ যদি কাঁধ মিলিয়ে তাদের পথ চলার জায়গা করে দেয়, তবে প্রতিটি বিশেষ শিশুই সমাজের বোঝা না হয়ে একেকজন অনন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে। আমাদের একটু সচেতনতা ও ভালোবাসাই পারে তাদের অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসতে।