একই ছাদের নিচে বছরেরপর বছর কেটে যায়। সকালের চায়ের কাপে চিনি কম নিয়ে অশান্তি থেকে শুরু করে মাসের বাজারের ফর্দ মেলানো, সন্তানের স্কুলের ফি দেওয়া, আরও কত সাংসারিক খুঁটিনাটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে। কিন্তু দিনশেষে যখন ঘরের বাতিটা নিভে যায়, তখন দুটি চাদরের মাঝখানে এক বিশাল অদৃশ্য দেয়াল এসে দাঁড়ায়। শরীর মেলালেই কি মন মেলে? নাকি মন না মিললে শরীর কেবলই একটা যান্ত্রিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়? বাঙালি দাম্পত্যে ‘যৌনতা’ বা ‘শারীরিক ঘনিষ্ঠতা’ শব্দটা এখনও যেন এক গোপন কুঠুরির গল্প। অথচ সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলছে, বিছানার দূরত্ব আসলে শুরু হয় মনের দূরত্ব । আর এই দূরত্ব কমানোর একমাত্র চাবকাঠি হলো—খোলাখুলি আলোচনা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ।
অনেক দম্পতির মধ্যেই একটা অলিখিত নিয়ম থাকে—"সব কথা মুখে বলতে হয় না।" কিন্তু শরীরী সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নীরবতা অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় তৈরি করে। একজন ভাবছেন সঙ্গী তাকে আর ভালোবাসেন না, অন্যজন হয়তো ক্লান্তির কারণে গুটিয়ে আছেন। এরপর জমা হয় অভিমান। মুখে না বলা এই ছোট ছোট অভিমানগুলো জমে জমে একসময় শারীরিক অনীহা বা ‘বেডরুম ডেডলক’ তৈরি করে। আপনার সঙ্গী, সবসময় আপনার মন পড়তে পারেন না—এই সহজ সত্যটা মেনে নেওয়া জরুরি। আপনার কী ভালো লাগছে, কোন স্পর্শে আপনি স্বস্তি পাচ্ছেন, কিংবা কখন আপনার শরীর সাড়া দিচ্ছে না—তা যদি প্রকাশ না পায়, তবে শারীরিক সম্পর্ক কেবলই একতরফা কর্তব্যে পরিণত হয়।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কেবল হরমোনের খেলা নয়, এটি মূলত একটি মানসিক অনুভূতি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, মানসিক নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার প্রকাশ শারীরিক আকর্ষণের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। যখন দুজন মানুষ তাদের সারাদিনের ক্লান্তি, ভয়, আনন্দ, এমনকি নিজেদের ভেতরের ইনসিকিউরিটি বা দুর্বলতা নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি বসতে পারেন, তখন এক অদ্ভুত মানসিক স্বস্তি তৈরি হয়।এই মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তিটাই বিছানায় দুজনের শরীরকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। মনের কথা খুলে বললে ভেতরের সব জড়তা কেটে যায়। তখন আর কোনো অভিনয় বা লোক দেখানো আনন্দের প্রয়োজন হয় না, সম্পর্কটা হয়ে ওঠে অনেক বেশি আন্তরিক ও গভীর।
"প্রেম করে বিয়ে" এর বাইরে, আরেঞ্জ ম্যারেজে লজ্জা এবং সামাজিক ট্যাবুর কারণে, এই বিষয়ে কথা শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন, সে আমরা যতই আধুনিক হয়ে থাকি না কেন । তবে কিছু সহজ উপায়ে এই দেয়াল ভাঙা সম্ভব, সঙ্গীর সাথে আক্রমণাত্মক না হয়ে আন্তরিক হোন, "তুমি আমাকে সময় দাও না" এভাবে না বলে বলুন, "আমার মনে হয় আমরা ইদানীং খুব দূরে সরে যাচ্ছি, শুরু করুন জীবন নিয়ে আলোচনা। মোবাইলে সময় না দিয়ে,সঙ্গীর সাথে ঘুরতে যান, একটু হেঁটে আসুন বা একটা ক্যান্ডেল লাইট রোমান্টিক ডিনার। মনে রাখা উচিত, শারীরিক সম্পর্ক মানেই কেবল বিছানায় দুটো মানুষের মিলন নয়। সারাদিনে কাজের ফাঁকে একটু জড়িয়ে ধরা, হাত ধরা বা কপালে চুমু খাওয়া—এই ছোট ছোট স্পর্শগুলো সঙ্গীর কাছে খুব দামি হয় রোমান্টিক মুডের বাইরে, সাধারণ অবসরে বা চা খেতে খেতে নিজেদের ভালোলাগা-মন্দলাগা নিয়ে হালকা ছলে কথা চলুক। দাম্পত্যে শরীর এবং মন, একে অপরের পরিপূরক। শরীর যদি হয় একটি সুন্দর ভাস্কর্য, তবে মন এবং মুখের ভাষা হলো তার প্রাণ। তাই মনের কথা লুকিয়ে রেখে বিছানায় সুখ খোঁজা বৃথা। আসুন, লজ্জা আর জড়তার খোলস ভেঙে সঙ্গীর হাতটা ধরি। কারণ,মনের ঘরটা যখন খোলামেলা বাতাসে ভরে ওঠে, তখন বিছানার দূরত্বটা নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়।