৮ই ডিসেম্বর। ম্যানহাটনের শীতটা সেবার খানিক তীব্র। গায়ে কাঁটা ধরাচ্ছে শৈত্য প্রবাহ। রাতটাও বেশ বেড়েছে। রাত বাড়লে, ঠান্ডা বাড়ে সমানুপাতিক হারে। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষারত মার্ক চ্যাপম্যান। উসখুস করছে সে। মাঝেমাঝে হাত ঘষে নিচ্ছে অতর্কিতে। হঠাৎ সতর্ক হয়ে যায় সে। দূরে একটা আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। ড্রাইভওয়ের অন্ধকারের বুক চিড়ে এগিয়ে আসছে একটা উজ্জ্বল আলো। অস্থির হয়ে ওঠে চ্যাপম্যান। এই লিমুজিনটার সাথে সে ভালোরকম পরিচিত। ডাকোটায় ঢোকার মুখে একটি পাথরের আর্চওয়ে, সেখানেই থেমে গেল গাড়িটা। মাত্র এক হাত দূরে গাড়ি থেকে নামলেন সৌম্যকান্তি চেহারার দীর্ঘকায় মানুষটি। চ্যাপম্যান এবার অস্ফুটে ডেকে উঠলেন আগন্তুককে, ‘জন লেনন’! আগন্তুক ফিরে তাকাতেই একবারও না থেমে টানা পাঁচবার গর্জে উঠলো পয়েন্ট থার্টি এইট স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলভার। বুকে গিয়ে বিঁধলো বুলেটগুলো। রাত ফুরোনোর বহু আগেই দাবানলের গতিতে ছড়িয়ে পড়লো দুসংবাদ। অজানা আততায়ীর গুলিতে নিহত জন লেনন।
পিছিয়ে যাওয়া যাক আরও দুই শতক। লিভারপুল শহরের এক সদ্য যৌবনে পা দেওয়া কিশোর গানবাজনার ঝোঁকে শুরু করেন একটি ব্যান্ড। নামকরণ করেন, ‘দ্য কোয়ারিমেন’। ভবিষ্যত তখনও দিন গুনছে বহু কুঁড়ি বিকশিত হওয়ার। সত্তরের ঘটনাবহুল বসন্তের পৃথিবী খুঁজে পাবে নিজের ভাষা। বিটলস। লেনন ও পল একসাথেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। পলের আঙুলের দক্ষতায় খেলা করতো গিটারের তার। মুগ্ধ হতেন জন। প্রথমে এই জুটি একসাথে স্কিফল ঘরানায় গানবাজনা শুরু করলেও, পরে যোগ দেন জর্জ হ্যারিসন। চার্চ, স্কুল ও নাইটক্লাবের শো পেরিয়ে নবীন এই গানের দল নিজের পথ তৈরী করতে থাকে। তাঁদের কণ্ঠ একসময় পশ্চিমা বিশ্ব পেরিয়ে পৌঁছে যায় প্রাচ্যও। লেনন ও ম্যাককার্টনির লেখনীতে, ‘প্লিজ প্লিজ মি’। পুরোপুরি রক এন্ড রোলের মেজাজ ধরে রাখতে সক্ষম হয় এই গান। পরবর্তীতে এলো ‘এবি রোড’, ‘হোয়াইট’ এবং সাড়া ফেলে দেওয়া অ্যালবাম ‘লেট্ ইট বি’। তবে ধীরেধীরে পলি পড়ে বন্ধুত্বে। ব্রায়নের মৃত্যু ও পরবর্তীতে পল ও লেননের বিবাদ একসময় পথ আলাদা হয়ে যায়।
জন্ম নেয় নতুন লেনন। যে লেনন প্রতিবাদী। মানুষের কথা বলেন। সোচ্চারে আওয়াজ তোলেন। অস্ত্র হিসাবে বেছে নেন গান। তিনিই ‘ইমাজিন’ করেন এক আজব কল্প দুনিয়ার, যেখানে সবাই শান্তিতে থাকে। তিনি যুদ্ধ থামিয়ে গিভ পিস এ চান্স বলে ওঠেন। তিনি তুচ্ছ করেন স্বর্গ নরকের অস্তিত্ব। তিনি স্বপ্ন দেখেন বিবাদহীন পৃথিবীর। আর এহেন ব্যক্তিত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে রাষ্ট্র। শোনা যায়, লেনন ও ইয়োকো ওনোর প্রতি নজর রেখেছিল সিআইএ। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন সাবধান হন অস্ত্রহীন এক পুরুষকে দেখে। নজরবন্দী হয়েছিলেন বহুদিন। তবু তিনি স্বাধীন এক পাখি। বুলেটের ক্ষত ভেঙে দেয় শৃঙ্খল। উড়ে যেতে চান এক শান্তির বিশ্বে। যেখানে কোনো ধর্ম নেই। সব মানুষ একসাথে থাকে।