প্রবল গতিতে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে আসছে জলরাশি। নেপালের উত্তর সীমান্তে হিমালয়ের পাদদেশে, তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা আকস্মিক হড়পা বান ও ভূমিধস সমগ্র নেপাল সহ হিমালয়ের পাদদেশে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২...
প্রবল গতিতে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে আসছে জলরাশি। নেপালের উত্তর সীমান্তে হিমালয়ের পাদদেশে, তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা আকস্মিক হড়পা বান ও ভূমিধস সমগ্র নেপাল সহ হিমালয়ের পাদদেশে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২৬ অগস্ট সকাল ৯টা নাগাদ নেপালের রাসুওয়া জেলায় আচমকাই নদীতে জলের পরিমাণ বেড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় রাসুওয়াঘাড়ি সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম গুলি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মেশানো স্রোত নেমে আসে ত্রিশুলি নদীতে। নতুন করে বিধস্ত হয় নেপালের পার্বত্য এলাকা।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখনও অব্দি ১৬০ জনের মৃত্যু খবর জানিয়েছে নেপাল প্রশাসন। ২৯০ জন বিদেশি সহ ৩৫০ জন পর্যটক নিখোঁজ, তার মধ্যে ভারতীয়র সংখ্যা ১৩৩ জন ,স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে তাঁরা সকলেই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। এছাড়াও নিখোঁজ প্রায় ৭৫০ জন। রাসুওয়াঘাড়ি ছাড়াও জলস্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুয়াকোট ও ধারিং জেলা, ভেসে গিয়েছে তিব্বতের স্থল বন্দর জিরং।
এর আগেও ভূমিকম্প সহ একাধিক হড়পা বানে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নেপাল। হিমালয়ের পাদদেশে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় বরাবরই বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। হিমালয়ের কোলে বুদ্ধের দেশ নেপাল প্রাকৃতিক ভাবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নেপাল সরকার সূত্রে জানানো হয়, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের একটি ভূমিকম্পের পরে বড় ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে যায়। পরে জলের স্রোত, সেই বাধ ভেঙে নেমে আসে নীচে। পরে এই দাবী খারিজ করে দিয়ে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানায়, ভূমি ও হিমবাহ ধস-ই এই বিপর্যয়ের কারণ। ভূ-বিজ্ঞানীদের অন্য আরেকটি দল জানায়, এই ধসের ফলে লেন্দে খোলার উপরে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নেমে নদী আটকে দিয়েছিল। অতিরিক্ত জল জমে যাওয়ার পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে স্রোত নেমে আসে নিচের দিকে, প্লাবিত হয় ভোটে কোশী নদী।
বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু বৃষ্টি নয়, হিমবাহের অতিরিক্ত গলন ও ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৫ সালেও একই সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৮১ সালে হিমবাহ গলে বিপর্যস্ত হয়েছিল নেপাল ভূখণ্ড। সাম্প্রতিক সময়ে, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার হার দ্বিগুণ ভাবে বেড়েছে। ফলে পাহাড়ের উপরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ। বিজ্ঞানীদের মতে, এই হ্রদ গুলিতে প্রাকৃতিক ভাবে যে বাঁধের সৃষ্টি হয় তার ধারণ ক্ষমতা মানুষ নির্মিত বাঁধের থেকে অনেকটাই বেশি, কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের কারণে, হ্রদগুলির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তে নীচের দিকে নেমে আসতে পারে বিপুল জলরাশি। এ ছাড়াও পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োজনের থেকে বেশি নির্মাণ কাজ, চিন-নেপাল বাণিজ্যপথে সেতু, রাস্তা, গড়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই বিপর্যয়ের একটি কারণ হতে পারে।
এই বিপর্যয়ের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও। ভোটে কোশী নদী এবং ত্রিশূলী নদীর জল এক হয়ে নারায়ণী নদী গঠন করেছে, যা ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে গণ্ডক বা নারায়ণী নদী নামে প্রবাহিত হয়। এই নদীর অববাহিকায় জলস্তর মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিহারের ৯টি জেলা এবং উত্তরপ্রদেশের ৭টি জেলায় হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দুই রাজ্যের প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে। বিহারের বাল্মীকি নগর ব্যারেজ ও অন্যান্য সংবেদনশীল বাঁধগুলির ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে, এবং নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগরের মতো সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলোতে নদীগর্ভে জলবৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রশাসনকে সর্বদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। নেপাল সীমান্তে কোশী ব্যারেজের সমস্ত ৫৬টি লকগেট খুলে দিয়ে বিগত ১৫ বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ জল নিষ্কাশন করা হয়েছে, যার ফলে ভাটির দিকে থাকা বিহারের সমতলে জল থইথই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেবল জলস্তর বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, নেপালে নিখোঁজ শত শত পর্যটকের মধ্যে শতাধিক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যার কারণে ভারতের সমতলের রাজ্যগুলোতে মানবিক উদ্বেগ ও চাঞ্চল্য তীব্র আকার ধারণ করেছে। আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ তৎপরতা বজায় রাখতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় বিপর্যয় সাড়া বল বা এনডিআরএফ (NDRF)-এর প্রায় ২০টি টিম ইতিমধ্যে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য আগামী দিনে হিমালয়ের উপরে নজরদারি ও আগাম সতর্কতা না বাড়ালে এরকম আরও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে হিমালয়ের কোলে।