Updated on : 8 September 2026 | 07:56:46 pm
Updated on : 8 September 2026 | 07:56:46 pm
মণি ভট্টাচার্য: দুর্গাপুজো মানেই কি নিরামিষ ভোগ? নাকি দেবীর আরাধনার সঙ্গে মাছ-মাংস ও বলিরও রয়েছে বহু পুরনো সম্পর্ক? শাক্ততন্ত্র, বনেদি বাড়ির রীতি, পূর্ববঙ্গের খাদ্যসংস্কৃতি এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া আচার, সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আমিষের গল্প আসলে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিরই এক দীর্ঘ ইতিহাস। শারদীয়ার কথা উঠলেই বাঙালির চোখের সামনে প্রথমে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে খিচুড়ি, লাবড়া, পাঁচরকম ভাজা, পায়েস আর ভোগের গন্ধ। অষ্টমীর অঞ্জলি দিয়ে নিরামিষ ভোগ খাওয়ার স্মৃতি বাঙালির পুজোর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই ছবিটাই কি দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ ইতিহাস?
একেবারেই নয়।
বাংলার বহু দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে মাছ, মাংস এমনকি পশুবলিরও ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে। আবার একই সময়ে বহু পুজোয় দেবীর ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ। অর্থাৎ দুর্গাপুজোর খাদ্যসংস্কৃতির কোনও একক ছক নেই। বরং কোন পরিবার শাক্ত, কোন পরিবার বৈষ্ণব, কোন অঞ্চল পূর্ববঙ্গের, কোনটি পশ্চিমবঙ্গের—তার উপর নির্ভর করে বদলে গিয়েছে দেবীর ভোগের থালা।
দেবীর সামনে মাছ-মাংসের ইতিহাস কত পুরনো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যের দিকে তাকাতে হয়। শাক্ত উপাসনায় দেবীকে কেবল মমতাময়ী মাতৃরূপে নয়, শক্তি, যুদ্ধ এবং অশুভের বিনাশের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। সেই ধর্মীয় পরম্পরার কিছু ধারায় রক্ত, বলি এবং আমিষ নিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল। মধ্যযুগীয় শাক্ত সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘কালিকা পুরাণ’-এ দেবীর উদ্দেশে বিভিন্ন ধরনের বলির উল্লেখ রয়েছে। গবেষণামূলক আলোচনায় দেখা যায়, এই গ্রন্থে মাছ, ছাগল, মহিষসহ বিভিন্ন প্রাণীকে দেবীর উদ্দেশে নিবেদনের কথা রয়েছে। এমনকি অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবী ও যোগিনীদের উদ্দেশে পশুবলির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় গৌড়ীয় রীতিরও উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনও শাস্ত্রে কোনও আচার বর্ণিত থাকলেই তা বাংলার প্রতিটি দুর্গাপুজোয় পালিত হত বা এখনও হয়, এমন নয়। ধর্মীয় গ্রন্থের বিধান, আঞ্চলিক রীতি এবং বাস্তব সামাজিক প্রথা—তিনটি সবসময় এক জিনিস নয়।
মহিষাসুর বধের সঙ্গে বলির সম্পর্ক
দুর্গাপুজোর কেন্দ্রে রয়েছে মহিষাসুর বধের কাহিনি। দেবী মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের রক্ষা করেন—এই কাহিনিই দেবীর যুদ্ধরূপকে প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী শাক্ত আচার-অনুষ্ঠানে মহিষ বা ছাগল বলির মতো প্রথার সঙ্গে এই যুদ্ধপ্রতীকের একটা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। কোথাও বাস্তব পশুবলি হয়েছে, কোথাও আবার সেই বলির পরিবর্তে কুমড়ো, আখ, চালকুমড়ো কিংবা অন্য কোনও প্রতীকী বস্তু ব্যবহার করা হয়েছে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার বহু পুজোয় পশুবলি বন্ধ হয়ে প্রতীকী বলি চালু হয়েছে। পরিবর্তিত সামাজিক মনোভাব, বৈষ্ণব প্রভাব এবং অহিংসার ধারণা—সব মিলিয়ে এই পরিবর্তন ঘটেছে বলে ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোচনায় উঠে আসে।
বনেদি বাড়ির পুজোয় মাছ-মাংস
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো এই ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দলিলগুলির একটি। কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন পুরনো পুজোয় আজও দেবীর ভোগে মাছের উপস্থিতি দেখা যায়। কোথাও সপ্তমীতে রুই, কোথাও নবমীতে বোয়াল, কোথাও ইলিশ, আবার কোথাও ল্যাটা মাছ পোড়া—রীতির কোনও শেষ নেই। বরিশা অঞ্চলের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোয় সন্ধিপুজোর খিচুড়ির সঙ্গে ল্যাটা মাছ পোড়ানোর ঐতিহ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজোয় পোনা মাছের কালিয়া, রুইয়ের পদ কিংবা মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা পদও ভোগের অংশ। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও নবমীর ভোগে পাঁঠার মাংসও রয়েছে। জঙ্গিপুরের একটি পুরনো পুজোয় লুচি, পোলাওয়ের সঙ্গে পাঁঠার মাংস ভোগ দেওয়ার ঐতিহ্যের কথা জানা যায়। অর্থাৎ বাঙালির দুর্গাপুজোর ভোগের ইতিহাসে মাছ যেমন রয়েছে, তেমনই কিছু শাক্ত পরিবারে মাংসের উপস্থিতিও অস্বাভাবিক নয়।
‘নিরামিষ মাছ’, এ কেমন কথা?
এখানেই আসে বাঙালির পুজোর খাদ্যসংস্কৃতির এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। অনেক পুজোয় মাছ রান্না হলেও তাতে পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করা হয় না। ফলে রান্নার ধরন এবং ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগের বিচারে সেটিকে অনেক পরিবার ‘নিরামিষ রান্না’ বলে মনে করে। আজকের খাদ্যবিজ্ঞানের ভাষায় মাছ অবশ্যই আমিষ। কিন্তু পুজোর আচারগত ভাষায় ‘নিরামিষ’ ও ‘আমিষ’-এর সংজ্ঞা সবসময় একই নয়। পেঁয়াজ-রসুন বর্জন, রান্নার পদ্ধতি এবং নিবেদনের নিয়ম—এসবের উপরেও অনেক পরিবারে খাদ্যের ধর্মীয় পরিচয় নির্ভর করে। এই কারণেই বাংলার কোনও কোনও পুজোয় দেবীর সামনে ইলিশ বা চিতল উঠলেও পরিবারের মানুষ সেটিকে সাধারণ দিনের আমিষ রান্নার মতো দেখেন না।
পূর্ববঙ্গ থেকে এপার বাংলা, বদলে গেলেও হারায়নি ঐতিহ্য
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে অসংখ্য পরিবার পশ্চিমবঙ্গে এসে বসতি গড়ে। তাঁদের সঙ্গে আসে খাবার, ভাষা, পোশাকের পাশাপাশি পুজোর নিজস্ব রীতিও। পূর্ববঙ্গের বহু পরিবারের দুর্গাপুজোয় মাছের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। কোথাও বোয়াল, কোথাও ইলিশ, কোথাও মাছের টক—এই সব পদ পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। দেশভাগের পরেও সেই রীতির অনেকটাই থেকে যায় এপার বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোয়। আজও জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির মতো কিছু পুজোয় ইলিশ, চিতল কিংবা মাছের মাথা দিয়ে তৈরি পদ দেবীকে নিবেদন করা হয়। আবার কোথাও সপ্তমী-অষ্টমী নিরামিষ, কিন্তু নবমীতে মাছ—অর্থাৎ একই পুজোর মধ্যেই খাদ্যরীতির পরিবর্তন ঘটে।
তাহলে নিরামিষ ভোগের এত জনপ্রিয়তা কেন?
কারণ বাংলার দুর্গাপুজোর আর একটি শক্তিশালী ধারা এসেছে বৈষ্ণব ও সাত্ত্বিক খাদ্যসংস্কৃতি থেকে। বহু ব্রাহ্মণ পরিবার এবং বৈষ্ণব পরিবারে দেবীর ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ। খিচুড়ি, লাবড়া, ভাজা, চাটনি, পায়েস, এই খাবারগুলিই হয়ে উঠেছে পুজোর ‘সর্বজনীন’ খাবার। বিশেষ করে বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজোর প্রসাদে নিরামিষ ভোগের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। কারণ সেখানে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের শাক্ত বা বৈষ্ণব রীতির বদলে বৃহত্তর সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি খাদ্যরীতি বেছে নেওয়া সহজ। ফলে আজকের শহুরে দুর্গাপুজোর সঙ্গে নিরামিষ ভোগের যে সম্পর্ক, তা মূলত আধুনিক সর্বজনীন উৎসবের সংস্কৃতিরও ফল।
আমিষ কি তবে ধর্মবিরোধী?
ইতিহাস তার উত্তর খুব স্পষ্টভাবে দেয়—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। একই বাংলায় এক পরিবারে দেবীকে খিচুড়ি-লাবড়া দেওয়া হয়, অন্য পরিবারে রুই মাছ; কোথাও ইলিশ, কোথাও পাঁঠার মাংস; আবার কোথাও পশুবলির পরিবর্তে চালকুমড়ো বা আখ উৎসর্গ করা হয়। এই বহুত্বই বাংলার দুর্গাপুজোর আসল চরিত্র। দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলার শাক্ত সাধনা, বৈষ্ণব প্রভাব, লোকাচার, জমিদারি সংস্কৃতি, দেশভাগের স্মৃতি এবং বাঙালির খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুর মিলিত ইতিহাস। আজ যখন পুজোর ভোগের থালায় ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি দেখা যায়, তখন তার পাশেই বাংলার অন্য কোনও পুরনো বাড়িতে হয়তো পাতে সাজানো থাকে ইলিশ। কোথাও আবার নবমীর রান্নাঘরে কড়াইতে ফুটছে মাংস।
দুই ছবিই সত্যি
কারণ বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস কখনও শুধু নিরামিষের ইতিহাস নয়, আবার শুধু আমিষের ইতিহাসও নয়। দেবীর পায়ের সামনে সাজানো সেই ভোগের থালা আসলে কয়েকশো বছরের বাংলার সমাজ, বিশ্বাস, রুচি ও পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।