ভূ-রাজনীতির নতুন দাবাখেলায়, হিমালয় অঞ্চলের জলসম্পদ এখন এক বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নেপাল। নেপাল, ভারত ও চীনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছ...
ভূ-রাজনীতির নতুন দাবাখেলায়, হিমালয় অঞ্চলের জলসম্পদ এখন এক বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নেপাল। নেপাল, ভারত ও চীনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল সমীকরণ। নেপালের পাহাড়ি ভূখণ্ডে প্রায়শই যে হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়, তার পেছনে কেবল প্রকৃতির রুদ্ররূপ নয়, বরং চীন ও ভারতের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক রেষারেষি এবং কৌশলগত চাল বড় ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে তিব্বত ও নেপাল সীমান্ত জুড়ে চীনের একের পর এক পরিকাঠামো নির্মাণ ও নদী শাসনের গোপন প্রচেষ্টা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালে বিধ্বংসী বন্যার পরেই, চিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নেপালের এক সাংবাদিক অভিযোগ করে দাবি করেন,চিন, বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে নেপালকে সময়মতো তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নেপালে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ঝাংমাওমিং এই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। চিনা রাষ্ট্রদূত ঝাংমাওমিং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে জিরং সীমান্ত এলাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগে শোকপ্রকাশ করে বলেছেন, 'এই দুর্যোগে চিন এবং নেপাল, উভয়েরই প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।' তিনি আরও জানান, এই কঠিন সময়ে চিন নেপালের পাশে দৃঢ় ভাবে রয়েছে। ঝাংমাওমিংয়ের দাবি, 'চিনে ক্ষয়ক্ষতি হলেও বেজিং দ্রুত নেপালের জন্য জরুরি ত্রাণ সামগ্রী ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। চিন নেপালকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা করবে।'
নেপালের নদীগুলো ভারতের উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের গঙ্গা অববাহিকার প্রধান উৎস। চীন অত্যন্ত চতুরতার সাথে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাত এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে, যার মূল লক্ষ্য নেপালের নদীগুলোর ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীন তিব্বত অংশে এমন কিছু কৃত্রিম হ্রদ এবং বাঁধ তৈরি করছে, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভারতের বিরুদ্ধে 'জল বোমা' হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্ষাকালে নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে যখন হড়পা বান পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন চীন থেকে আসা জল ও পাহাড়ি ধস সেই বন্যার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভারতের অভিযোগ, সীমান্ত অঞ্চলের জলপ্রবাহ ও নদী শাসন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চীন প্রায়শই গোপন রাখে, যা ভাটির দেশ ভারতের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। এই জল-রাজনীতি বা 'হাইড্রো-পলিটিক্স'-এর শিকার হচ্ছে নেপাল ও ভারতের সাধারণ মানুষ। নেপালে আকস্মিক বন্যা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিহার ও উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ কৃষিপ্রধান অঞ্চলে। চীন নেপালকে ভারতের বিরুদ্ধে উসকে দিতে এবং এই অঞ্চলের জলসম্পদের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে যে দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্তের জাল বুনছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে, অন্যদিকে চীনের এই আগ্রাসী নদী কূটনীতি ও তথ্য গোপনের কৌশল হড়পা বানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এক কৃত্রিম রাজনৈতিক মারণাস্ত্র বানিয়ে তুলছে।