রাজ্যের সমস্ত পুরসভা ও পুরনিগম এলাকার নাগরিক পরিষেবা উন্নত করতে এবং শহরের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতর। গত ২ জুন পুর বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে পুর কমিশনার ও প্রশাসকদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। তার পরদিনই, অর্থাৎ ৩ জুন, দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব খলিল আহমেদ সমস্ত পুর সংস্থাকে সরকারি নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য একটি জরুরি নির্দেশিকা পাঠায়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বেআইনি নির্মাণ ও বায়োমেট্রিক হাজিরা—শহরের সার্বিক শৃঙ্খলা ফেরাতে মূলত যে বিষয়গুলির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তা হলো-
১. বর্জ্য পৃথকীকরণ ও সাফাই অভিযান:
উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ: প্রতিটি বাড়ি থেকে পচনশীল (ভিজে) এবং অপচনশীল (শুকনো) বর্জ্য আলাদা দুটি পাত্রে সংগ্রহ করতে হবে। ৭ দিনের সচেতনতা প্রচারের পর কোনও পরিবার আলাদা করে আবর্জনা না দিলে, তাদের বাড়ি থেকে পুরকর্মীরা আবর্জনা সংগ্রহ করবেন না।
খোলা গাড়িতে আবর্জনা নয়: আবর্জনা পরিবহনের সময় তা কোনওভাবেই খোলা রাখা যাবে না। নোংরা ছড়ানো আটকাতে ঢাকা গাড়িতে করে ময়লা নিয়ে যেতে হবে।
সকাল থেকে নজরদারি: পুরসভার সিনিয়র আধিকারিকদের প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে মাঠে নেমে সাফাই কাজ তদারকি করতে হবে এবং জিও-ট্যাগ করা ছবি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠাতে হবে।
২. যত্রতত্র নোংরা ও থুতু ফেললেই হবে জরিমানা:
আগামী তিন মাস ধরে জনসমক্ষে থুতু ফেলা বা নোংরা ফেলার বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রচার চালানো হবে। এরপর ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ থেকে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ ও জরিমানা করা হবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের বিরুদ্ধেও ১ সেপ্টেম্বর থেকে অভিযান তীব্র করা হবে।
৩. সরকারি কর্মীদের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা:
আগামী ১ আগস্ট, ২০২৬ থেকে সমস্ত পুর আধিকারিক, কর্মী ও শ্রমিকদের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। সকাল ১০টার মধ্যে (১৫ মিনিট ছাড় সহ) অফিসে রিপোর্ট করতে হবে। পর পর ৩ দিন দেরি করলে ১ দিনের অনুপস্থিতি গণ্য করা হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী বেতন কাটা হতে পারে। বিকেল ৫:১৫ মিনিটের আগে অনুমতি ছাড়া অফিস ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
৪. বে-আইনি নির্মাণ ও জলাশয় ভরাট রুখতে কঠোর পদক্ষেপ:
বেআইনি বাণিজ্যিক ভবন: ফায়ার লাইসেন্স বা ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া চলা বেআইনি বাণিজ্যিক ভবন চিহ্নিত করে নোটিশ পাঠাতে হবে এবং প্রতি সপ্তাহে অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
জলাশয় রক্ষা: বেআইনিভাবে পুকুর বা জলাশয় ভরাট অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে এফআইআর (FIR) দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. ফুটপাথ দখলমুক্ত করা ও পার্কিং নিয়ন্ত্রণ:
উচ্ছেদ অভিযান: রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করে থাকা বেআইনি দোকান বা কাঠামো নোটিশ দিয়ে সরিয়ে দিতে হবে। পিচ রাস্তার ওপর কোনো হকার বসতে পারবেন না।
একমুখী পার্কিং: রাস্তার কেবল একপাশেই পার্কিং করা যাবে। নির্দিষ্ট বোর্ড দেখে এবং ইউনিফর্ম পরা অনুমোদিত কর্মীদের মাধ্যমেই পার্কিং ফি সংগ্রহ করতে হবে।
৬. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা:
পর্যটন কেন্দ্রে আধুনিক শৌচাগার: আগামী ২০ জুনের মধ্যে প্রধান পর্যটন কেন্দ্র, মন্দির ও সমুদ্র সৈকতগুলিতে ডায়াপার পরিবর্তনের সুবিধাযুক্ত 'অ্যাসপিরেশনাল পাবলিক টয়লেট' তৈরি করতে হবে।
মন্দিরের ফুলের বর্জ্য: যে সমস্ত মন্দিরে প্রচুর ফুল ও মালা অপচয় হয়, সেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) মহিলাদের সহায়তায় ফ্লাওয়ার ওয়েস্ট প্রসেসিং ইউনিট গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল ইনভেন্টরি: পুরসভার সমস্ত সম্পত্তি ডিজিটাল ইনভেন্টরি ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনা হবে এবং সমস্ত বেআইনি হোর্ডিং অবিলম্বে খুলে ফেলা হবে।
নগরোন্নয়ন দফতরের এই কড়া নির্দেশের পর রাজ্যজুড়ে পুরসভাগুলি কতটা তৎপরতার সাথে এই নিয়মগুলি লাগু করে, এখন সেটাই দেখার।