অসীম সেন: সনাতন ধর্ম ঠিক কতটা প্রাচীন? প্রশ্নটা সহজ হলেও উত্তর খুঁজে পাওয়া অতটা সহজ নয়। ঈশ্বর প্রথম মানবরূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন বামন অবতারে। ব্রহ্মাপুত্র মনু র থেকেই প্রথম মানবজাতির সূচনা হয়। সনাতন ধর্...
অসীম সেন: সনাতন ধর্ম ঠিক কতটা প্রাচীন? প্রশ্নটা সহজ হলেও উত্তর খুঁজে পাওয়া অতটা সহজ নয়। ঈশ্বর প্রথম মানবরূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন বামন অবতারে। ব্রহ্মাপুত্র মনু র থেকেই প্রথম মানবজাতির সূচনা হয়। সনাতন ধর্মে রামায়নের পূর্বেও একটি যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ বা দশ রাজার যুদ্ধ।একটা মতে খ্রিষ্টপূর্ব্দ প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে পঞ্চাবের পারুষ্ণী বর্তমান রাভী নদীর তীরে তৃত্সু-ভরত বংশের রাজা সুদাস এবং দশটি ভিন্ন রাজ্যের জোটের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।
তখনও লৌহযুগের সূচনা হয়নি। ব্রোঞ্জ যুগের শেষ সময়ে এ যুদ্ধ ছিল প্রথম রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত যুদ্ধ। চন্দ্রবংশীয় রাজাদের মধ্যে বিভাজনে এই যুদ্ধ হয়। চন্দ্রবংশীয় পাঁচ রাজার সঙ্গে জোট তৈরি করে অনার্য পাঁচ গোষ্ঠী। লড়াই বাঁধে সুদাসের সঙ্গে। ঋগ্বেদের বর্ণনা অনুযায়ী, এই যুদ্ধটি মূলত আজকের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী অববাহিকায় সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল পুরোহিতের পদ পরিবর্তন। সুদাস তাঁর প্রধান পুরোহিত বিশ্বামিত্রকে সরিয়ে বশিষ্ঠদেবকে নিযুক্ত করেন। তখন প্রধান পুরোহিত ছিলেন রাজ্যের মূল চালিকা শক্তি। অপমানে ক্ষুব্ধ হয়ে ঋষি বিশ্বামিত্র সুদাসের বিরুদ্ধে দশ শক্তিশালী উপজাতির জোট গঠন করেন।
কিন্তু যুদ্ধের সলতে পাঁকানো হচ্ছিল আরও বহু আগে থেকেই। রাভী নদীর জল এবং উর্বর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিল সুদাসের হাতে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জন্মাচ্ছিল চন্দ্রবংশীয় অন্য রাজাদের। এছাড়াও ভরত বংশের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবকে রুখে দেওয়াও লক্ষ্য ছিল। যুদ্ধে পাঁচটি আর্য উপজাতি ছিল পুরু, যদু, তুর্বশ, অনু এবং দ্রুহ্যু এরই সঙ্গে পাঁচটি মিত্র অনার্য উপজাতি ছিল অলীন, ভলান, পখ্থ, শিব, বিষাণিন। যুদ্ধে ইন্দ্রের সহযোগিতায় জয়ী হন সুদাস। যুদ্ধের সময় সুদাসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বিরোধীরা নদীর বাঁধ ভেঙে দেয়। কিন্তু ইন্দ্রের হস্তক্ষেপের বাধ ভাঙা নদীর জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনু ও দ্রুহ্যু বংশের রাজা সহ বহু সৈন্যকে। এই জয়ের ফলে ভরত উপজাতি সমগ্র উত্তর ভারতে একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই ভরত বংশের নাম অনুসারেই পরবর্তীতে আমাদের দেশের নাম হয় ভারতবর্ষ। পরবর্তীতে পরাজিত পুরু বংশ এবং বিজয়ী ভরত বংশ একত্রিত হয়ে কুরু উপজাতির সৃষ্টি করে, যা মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের পটভূমি তৈরি করেছিল। বিজয়ী রাজা সুদাসের ভরত বংশের মূল ঘাঁটি ছিল বর্তমান ভারতের হরিয়ানা ও উত্তর রাজস্থান সংলগ্ন সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর মধ্যবর্তী অববাহিকায় । অন্যদিকে, পরাজিত ১০ রাজার জোট এসেছিল আজকের আফগানিস্তান, কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে।ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে এই যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। rnrnআ পক্থাসো ভলানসো ভনন্তালিনাসো বিষাণিনঃ শিবাসঃ। rnআ যোঽনয়ৎসধমা আর্যস্য গব্যা তৃৎসুভ্যো অজগন্যুধা নৃন্॥ rnrnযার সরলার্থ হল ,পক্থ, ভলান, অলীন, বিষাণিন এবং শিব উপজাতির লোকেরা সমবেত হয়েছিল। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র বিজয়ী আর্য তৃৎসু ও ভরত বংশের গাভী উদ্ধার করলেন। এবং যুদ্ধে শত্রুদের পরাজিত করে সুদাসের সহায় হলেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় ইন্দ্র সুদাসের গাভী উদ্ধার করলেন। আসলে তখন কোন রাজার কত সম্পদ ছিল তা নির্ভর করত পালিত পশুর ওপর। শত্রুপক্ষ রাভী নদীর জলধারা ঘুরিয়ে দেবার জন্য বাঁধ কেটেছিল, ইন্দ্রের কৃপায় সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছিল। rnrnদুরোণাশ্বস্য পশ্যা জঘন্হান্ মিত্রো ন কম্ চক্খাদানো অপবৃণক্ পারুষ্ণিম্।rnঅর্ণাংস্যুৎসসৃজে সুদাস আ রাজন্ স মহান্ অহীন্ অনয়ৎ সখায়ঃ॥rnrnএর সরলার্থ হল, শত্রুরা পারুষ্ণী নদীর জলপ্রবাহকে নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিশ্বভুবনের রক্ষক ইন্দ্রের ইচ্ছায় সেই তীব্র জলস্রোত সুদাস রাজার জন্য পথ উন্মুক্ত করে দিল এবং অগভীর হয়ে গেল। কিন্তু সুদাস রাজার শত্রুরা সেই নদীর জলেই ভেসে গেল। এবার প্রশ্ন হল তখন কী রামের পূর্বপুরুষ বা ইক্ষ্বাকু বংশের উদ্ভব হয়নি, যদি হয়ে থাকে তাহলে তারা এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি কেন?
প্রথমেই বুঝে নিতে হবে অযোধ্যার অবস্থান উত্তরপূর্ব ভারতে এবং এই যুদ্ধস্থল উত্তর পশ্চিম ভারতে। উভয়ের মধ্যে কয়েকশো মাইল তফাৎ ছিল। তাছাড়া দশ রাজার যুদ্ধ মূলত হয়েছিল চন্দ্রবংশীয় আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক গোলোযোগের জন্য। সেখানে সূর্য বংশীয় ইক্ষ্বাকুদের নিজেদের জড়িয়ে ফেলার কোনও কারণ ছিল না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা যখন এই দশ রাজার যুদ্ধ চলছিল তখন অযোধ্যায় রামের পূর্বপুরুষ মান্ধাতা, সগর, বা দীলিপ রাজত্ব করছিলেন। সৃষ্টির শুরুতে বৈবস্বত মনুর পুত্র রাজা ইক্ষ্বাকু অযোধ্যায় এই সূর্যবংশের পত্তন করেন। রাম ছিলেন এই বংশের ৮১ প্রজন্মের রাজা।
কিন্তু আসল প্রশ্নটা হল, যে বশিষ্ঠ এবং বিশ্বামিত্রের পরস্পর বৈরীতার জন্য এই দশ রাজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তাঁরা কীভাবে পরবর্তী কালে একজোটে অযোধ্যা নরেশ দশরথের রাজসভা আলো করেছিলেন। এই দুই ঋষি দীর্ঘজীবী। এরা পরবর্তীকালে নিজেদের মধ্যে ইগো মিটিয়ে বশিষ্ঠ হয়েছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের কুলগুরু, এবং বিশ্বামিত্র হয়েছিলেন রামেদের অস্ত্রগুরু। তবে এই বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ দশ রাজার যুদ্ধের দুই ঋষি নাকি তাঁর পরবর্তী বংশধর তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।