মণি ভট্টাচার্য: রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, থাকে কেবল পরিস্থিতি। আর সেই পরিস্থিতিই কখনও কখনও এমন পরিহাস রচনা করে, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে তেমনই এক ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। যাঁকে কয়েক মাস আগেও তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছিল, যাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার কথা বলেছিল, যাঁকে কটাক্ষ করে "ভ্যানিশ কুমার" বলা হয়েছিল, আজ সেই জ্ঞানেশ কুমারের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে তৃণমূলের দুই শিবির। কারণ, দলের প্রকৃত পরিচয় ও প্রতীকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাপ্রবাহ কেবল রাজনৈতিক নাটকীয়তা নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৃণমূলের ধারাবাহিক আক্রমণ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। দলের অভিযোগ, কমিশন বিজেপির সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যক্তিগতভাবেও নিশানা করা হয়।দিল্লিতে কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠকে অভিযোগ করেছিলেন, কমিশন বিরোধীদের বক্তব্য শুনলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। একইভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একাধিকবার কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনী আচরণবিধি, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনে তৃণমূল।
রাজনৈতিক মঞ্চে জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যঙ্গ করে "ভ্যানিশ কুমার" বলেও কটাক্ষ করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সাধারণ মানুষের অভিযোগের সময় তিনি "উধাও" হয়ে যান, কিন্তু বিজেপির স্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ করেন। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই নয়, সংসদীয় স্তরেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। বিরোধী জোটের উদ্যোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের সম্ভাব্য ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়, যেখানে তৃণমূল ছিল অন্যতম সক্রিয় দল।
তারপর এল রাজনৈতিক ভূমিকম্প
কিন্তু বাংলার রাজনীতি অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন মোড় নেয়। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ভাঙন দেখা দেয়। দলের একাংশ আলাদা রাজনৈতিক পথ বেছে নেয়। লোকসভায় সাংসদদের মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবির, অন্যদিকে বিদ্রোহী সাংসদদের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। প্রশ্ন ওঠে লোকসভায় আসল তৃণমূল কারা? কারা দলীয় হুইপ জারি করতে পারবে? দলের সংসদীয় নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে? ভবিষ্যতে দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক অধিকারের প্রশ্নেও আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর সেখানেই আবার সামনে আসে সেই নির্বাচন কমিশন।
যে কমিশনের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, আজ সেই কমিশনের সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা দলীয় স্বীকৃতি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনই তা নির্ধারণ করে। অতীতে শিবসেনা, এনসিপি, লোক জনশক্তি পার্টি—একাধিক ক্ষেত্রে কমিশনই সিদ্ধান্ত দিয়েছে কোন পক্ষ প্রকৃত দল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং কার হাতে থাকবে প্রতীক। অর্থাৎ, আজ যদি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক, সাংগঠনিক পরিচয় বা আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রেও থাকবে নির্বাচন কমিশন। আর সেই কমিশনের নেতৃত্বেই রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। রাজনীতির এই মোড় নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। যাঁকে কয়েক মাস আগেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছিল, আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তই হতে পারে তৃণমূলের ভবিষ্যতের অন্যতম নির্ধারক।
গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানের মূল্য এখানেই
এই ঘটনাকে কেবল রাজনৈতিক পরিহাস বললে ভুল হবে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বেরও একটি বাস্তব উদাহরণ। সরকার বদলায়, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলায়, বক্তব্য বদলায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান একই থাকে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধিতায়, শেষ পর্যন্ত তাদেরও সেই প্রতিষ্ঠানগুলির কাছেই ন্যায়বিচার চাইতে হয়, যাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে একসময় প্রশ্ন তুলেছিল।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করার অধিকার নেই। গণতন্ত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অংশ। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ব্যক্তি আক্রমণ, অবমাননাকর বিশেষণ বা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থানই রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
সময়ই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষক
বাংলার রাজনীতি বহু নাটকীয় মুহূর্ত দেখেছে। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে এই ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় শিক্ষা দিয়ে যায়—রাজনীতিতে মুহূর্তের আবেগে উচ্চারিত বক্তব্য অনেক সময় ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। যে নির্বাচন কমিশনকে একসময় "পক্ষপাতদুষ্ট" বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, আজ সেই কমিশনের কাছেই কার্যত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি প্রত্যাশা করছে তৃণমূলের বিভিন্ন শিবির।সময় সত্যিই বড় অদ্ভুত। রাজনীতিতে আজ যার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, আগামীকাল হয়তো তাকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আর সেই কারণেই গণতন্ত্রে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদা দেওয়ার সংস্কৃতিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে টেকসই হয়ে ওঠে।