অসীম সেন: শুনতে ভালো লাগে লড়াই হওয়া উচিত ভাতের, জাতের নয়। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে ভারতকে সবসময় জাতের লড়াই ই লড়তে হয়েছে। তখনও বিদেশের চোখ পড়েনি ভারতের ওপর। পারস্যের পর্যটক আব্দুর রাজ্জাক বিজ...
অসীম সেন: শুনতে ভালো লাগে লড়াই হওয়া উচিত ভাতের, জাতের নয়। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে ভারতকে সবসময় জাতের লড়াই ই লড়তে হয়েছে। তখনও বিদেশের চোখ পড়েনি ভারতের ওপর। পারস্যের পর্যটক আব্দুর রাজ্জাক বিজয়নগর সাম্রাজ্য পরিদর্শনের পর লিখেছিলেন, " এমন শহর গোটা পৃথিবীতে তিনি কোথাও দেখেননি। এখানে হাতিদের পর্যন্ত সোনা ও মূল্যবান রত্ন দিয়ে সাজানো হয়।"
ভারতে নানা ভাষাভাষি, নানা জাতের মানুষ বরাবর একই সঙ্গে বসবাস করে এসেছে। শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু জাত নিয়ে লড়াই শুরু হল মুসলিম শাসনের পর থেকে। ভারতে মুসলিমদের পা পড়েছিল সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে। আরব বণিক ও সমুদ্রযাত্রীরূপে কেরালার মালাবার উপকূলে ইসলামের প্রথম উপস্থিতি ঘটে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতে প্রথম মুসলিম সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ঘটে। ১২০৬ সালে কুতুবউদ্দিন আইবকের মাধ্যমে ভারতে প্রথম স্থায়ী দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম আগ্রাসন এতটাই প্রবল ছিল যে ধীরে ধীরে মুছে গেল ভারতীয় রাজত্বের গৌরবগাথা।
আমরা ভুলতে বসেছি খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ অব্দের মৌর্য সাম্রাজ্যের কথা। আমরা ভুলে গিয়েছি সমুদ্রগুপ্ত, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মত সম্রাটদের। রাজরাজ চোল, রাজেন্দ্র চোলের আমলে তাদের সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আলোচনার বিষয় ছিল। আমরা ভুলে গিয়েছি তাদের কথা। আমরা ভুলে গিয়েছি পৃথ্বীরাজ চৌহান চাইলে প্রথম তরাইনের যুদ্ধেই মুহাম্মদ ঘোরির খেলা সমাপ্ত করে দিতে পারতেন। কিন্তু তার দয়ায় বেঁচে যাওয়া ঘোরি নিজের জাত চেনালেন কথার খেলাপ করে। ইতিহাস মনে রাখল মুহাম্মদ ঘোরির জয়।
যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের সম্পর্কে, অধিকাংশ হিন্দু উত্তর দিতে পারবেন না। অথচ কাশ্মীরের এই বীর রাজা অষ্টম শতাব্দীতে আরব আক্রমণকারীদের পাঠিয়েছিলেন দেশের বাইরে। মধ্য এশিয়া পর্যন্ত তিনি নিজের রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। অষ্টম শতাব্দীতে মেওয়ারের গুহিল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাপ্পা রাওয়াল আরব আক্রমণকারী মুহাম্মদ বিন কাসিমের বাহিনীকে কচুকাটা করেছিলেন অথচ আমরা ভুলে গিয়েছি তাঁর নাম। মহারানা প্রতাপকে পূর্ণশক্তি দিয়েও আটকাতে পারেনি মুঘল সাম্রাজ্য। সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য মুঘল ও আফগানদের সঙ্গে লড়াই করে ১৫৫৬ সালে দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। আসামের অহোম সেনাপতি লাচিত বরফুকন, ১৬৭১ সালে সরাইঘাটের যুদ্ধে মুঘলদের শোচনীয় ভাবে হারান। বাংলার প্রতাপাদিত্য ও কৃষ্ণচন্দ্র রায়ও মুঘল আগ্রাসনকে ঠেকিয়েছিলেন। তবুও তাঁরা আলোচনায় আসেননি কখনও।
মুঘলদের বর্ণনায় হিন্দু রাজাদের কথা আড়ালে থেকে গিয়েছে। দুর্ভাগ্য, আমরাও সেই নামগুলিকে তুলে ধরার চেষ্টা করিনি কখনও। আমরা মুঘলদের গৌরবগাথা শুনতে অভ্যস্ত। আমরা ইসলামিক ইতিহাসকে শিরোধার্য করেছি বরাবর। হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইটা তাই ভাতের নয়, জাতের। বাংলাদেশ থেকে মাথার ছাদ হারিয়ে যে হিন্দুরা এদেশে এসেছিলেন তাঁরা ভাতের লড়াই লড়েননি। নোয়াখালিতে হিন্দু নিধন ভাতের জন্য হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর মুখ্যমন্ত্রীত্বে ঘটেছিল কলকাতা কিলিংস। মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে রুখতে অস্ত্র ধরেছিলেন গোপাল পাঠা। তখনও লড়াইটা ছিল জাতের। সুতরাং হিন্দু, হিন্দুত্ব, হিন্দুবাদী কথাগুলি বাঁচিয়ে রাখতে গেলে জাতের লড়াই ই করতে হবে। ভারতবর্ষ বহু ফুলের ফুলদানি। এদের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে যখন মুসলিম শাসকরা এদেশের অংশ হয়েছেন। ফুলের মধ্যে কাঁটা এসেছিল তখনই।rn