অসীম সেন: রাজনীতি যদি শুধুমাত্র সমাজসেবাই হবে তাহলে এতো অসৌজন্যবোধ কেন? কেন কুণাল ঘোষ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে চা খেলে গেলো গেলো রব ওঠে। কেন সাফাই দিতে হয় নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য? বিরোধীদে...
অসীম সেন: রাজনীতি যদি শুধুমাত্র সমাজসেবাই হবে তাহলে এতো অসৌজন্যবোধ কেন? কেন কুণাল ঘোষ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে চা খেলে গেলো গেলো রব ওঠে। কেন সাফাই দিতে হয় নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য? বিরোধীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেও দল বদলের গন্ধ পাওয়া যায় বাংলায়। এ গল্প আজকের নয়। এখন বাম আর কংগ্রেসে জোট হয়। কিন্তু এককালে এই দুই শিবিরে পরস্পরের জন্য ছিল শুধু শেষ না হওয়া শত্রুতা। মালদার গনিখান চৌধুরী তখন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভরকেন্দ্রের নাম। গনিখান চৌধুরীর ছায়া তাঁর মৃত্যুর পরেও সম্পূর্ণ ভাবে সরাতে পারেনি কোনও রাজনৈতিক দল। গনিখানের নামে কটূক্তি করে জল খেতেন বাংলার বামপন্থী নেতারা। এই গনিখানের সঙ্গে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল জ্যোতি বসুর। এই বন্ধুত্বের ফলে মাঝেমধ্যেই জল্পনা শুরু হত গনিখান কি সিপিএম এ যোগ দিচ্ছেন নাকি জ্যোতি বসু কংগ্রেসে।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। মালদা সফরে গয়েছিলেন জ্যোতি বসু। মালদায় সৌরীন মিশ্র তখন কংগ্রেসের দাপুটে নেতা এবং প্রফুল্লচন্দ্র সেনের মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী। সৌরীন মিশ্র রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে ট্যাক্সিচালক সবাইকে বলে রেখেছিলেন চিনের দালাল জ্যোতি বসু কে কেউ যেন নিজেদের গাড়িতে না চাপায়। খবর গেল কোতোয়ালি ভবনে। গনিখান জ্যোতি বাবুকে জানান 'আপনার জন্য আমার গাড়ি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে'। সেদিন গনি খানের গাড়িতে চড়ে কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন জ্যোতিবাবু। দুদিনের মালদা সফরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ঝড় তোলেন। রাতের খাওয়াদাওয়া সারেন কোতোয়ালি ভবনে। সৌরীন মিশ্র গোটা বিষয়টি ভালো ভাবে নেননি। অভিযোগ গেল প্রফুল্ল সেনের কাছে । প্রফুল্ল সেন বরকত সাহেবের পদোন্নতি করেছিলেন। জ্যোতি বসু খেতে ভালো বাসতেন। গনিখানের বোন রুবি নূরের বাড়ি থেকে মাসে দু তিন বার বিরিয়ানি যেত জ্যোতি বসুর বাড়িতে। গনিখান একবার অসুস্থ। কংগ্রেস নেতারা ফোনে কুশলবার্তা নিলেন। জ্যোতি বাবু সোজা কোতোয়ালি ভবনে চলে যান। বন্ধুকে দেখে গনিখান চাঙ্গা। দুই বন্ধুতে সেদিন দেদার আড্ডা চলেছিল। সিপিআইএম নেতাদের অভিমান হলে জ্যোতিবাবু মুখ ভেংচে বলেছিলেন , 'আমার বয়েই গেছে'।
বিধান রায়ের সঙ্গে জ্যোতি বসুর সম্পর্ক নিয়েও অনেক গল্প রয়েছে। বিধান রায় তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। চৌরঙ্গীতে বিধান রায়ের জনসভা। গাড়ি নিয়ে যেতে যেতে দেখলেন, জ্যোতি বসু পায়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছেন। জানা গেল ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিতে যাচ্ছেন জ্যোতি বসু। বিধান রায় জ্য়োতি বসুকে বলেছিলেন,' খালি পেটে বিধান রায়কে হারানো যাবে না। গাড়িতে এসো খান কয়েক লুচি আছে। দুজনে মিলে খাই তারপর বিধান রায়কে যত খুশি গালাগালি কর'। বিধানসভায় তৎকালীন বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুকে বেশি উত্তেজিত হয়ে চেঁচাতে দেখলে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় মাইক্রোফোন এই বলেন , 'জ্যোতি, অত চিল্লিও না। শেষে রাতে আমার কাছেই আসবে ওষুধ নিতে'। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে এরা প্রত্যেকেই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করতেন। কিন্তু সৌজন্যবোধ হারাননি কখনওই। আজকে সবকিছুই বদলে গিয়েছে। একে অপরকে অপমানের মধ্যেই রাজনৈতিক জয় খোঁজে প্রত্যেকে। ভোট হয়, তবে এরকম গল্প আর তৈরি হয় না।