Updated on : 2 September 2026 | 07:40:07 pm
Updated on : 2 September 2026 | 07:40:07 pm
অনিন্দ্য বিশ্বাস: তিব্বতী শব্দ ‘দোর্জে’ অর্থাৎ বজ্রধ্বনি এবং ‘লিঙ্’ একটি জায়গা বা দেশ, দার্জিলিং-এর মানে করলে দাঁড়ায় 'বজ্রধ্বনির দেশ', পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে অবস্থিত একটি শৈলশহর। পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা, সবুজের আস্তরণ, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার ঘুমন্ত বুদ্ধ দার্জিলিংকে পাহাড়ের রানী করে রেখেছে। ১৮৩৫ সালে সিকিম রাজার সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তি হলে দার্জিলিং ব্রিটিশদের হাতে আসে। সিয়াম রাজা উপহার হিসাবে ১৩৮ বর্গমাইলের এই পাহাড়ি এলাকা ব্রিটিশদেরকে ছেড়ে দেন। ১৮৫৪ ও ১৮৬৬ সালের মধ্যে ভুটান সংলগ্ন তরাই অঞ্চলের কিছু অংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হলে দার্জিলিং বর্তমান রূপ ও আয়তন লাভ করে। ব্রিটিশদের হাতে সাজানো এই শৈলশহর আজ দাঁড়িয়ে আছে খাদের কিনারায়। বেশ কয়েক বছর ধরে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়গুলি চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে পরিবেশবিদদের কপালে। তাদের আশঙ্কা, অচিরেই একদিন মানচিত্র থেকে মুছে ধ্বংসের অতলে চলে যেতে পারে শৈলরানী দার্জিলিং।
হিমালয় মানেই বরফাবৃত চূড়া, সবুজ উপত্যকা আর শান্ত নদীর কলতান। কিন্তু আজ এই সুন্দর পার্বত্য অঞ্চল এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে হিমালয় এখন ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ধস, হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যা এবং তীব্র ভূমিকম্পের আশঙ্কা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। হিমালয় পৃথিবীর নবীনতম ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি। হিমবাহের অবক্ষেপ দিয়ে গড়া এর পাহাড়ি ঢাল এখনও সুস্থিত নয়। এ অঞ্চলের মাটি আলগা, ঝুরঝুরে। ফলে মাটির ক্ষয় বেশি। অঞ্চলটি ভূমিধসপ্রবণ। সবচেয়ে বড় বিপদের কথা হিমালয় এক উচ্চ-ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এই অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্প এবং ভূমির এই অস্থিরতার মূল কারণ লুকিয়ে আছে মাটির গভীরে, টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার মধ্যে। কোটি কোটি বছর আগে ভারতীয় ভূখণ্ড বা 'ইন্ডিয়ান প্লেট' উত্তর দিকে এগোতে এগোতে এশীয় ভূখণ্ড বা 'ইউরেশিয়ান প্লেট'-এর সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এই দুই বিশাল মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই তৈরি হয়েছিল আজকের হিমালয় পর্বতমালা। এই ধাক্কা বা সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি কিন্তু অতীত হয়ে যায়নি, বরং আজও তা অবিরতভাবে ঘটে চলেছে।বর্তমানে ইন্ডিয়ান প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর দিকে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। দুটি প্লেটের এই ক্রমাগত মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে মাটির নিচে তীব্র চাপ ও বিপুল পরিমাণ স্থিতিশক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। যখন এই চাপ সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়, তখন মাটির নিচের শিলাস্তরে ফাটল ধরে এবং সঞ্চিত শক্তি আচমকা তীব্র কম্পন হিসেবে মুক্ত হয়। এটাই আমাদের কাছে ভয়াবহ ভূমিকম্প রূপে প্রকাশ পায়। হিমালয়ের পুরো পার্বত্য অঞ্চলটিই যেহেতু এই দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে (ফল্ট লাইন) অবস্থিত, তাই এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বা 'সিসমিক জোন ৫'-এর মধ্যে পড়ে। প্লেটের এই ক্রমাগত সরে যাওয়া এবং মাটির নিচের এই অস্থিরতা হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় মাটির নিচে একটি বিশাল 'সিসমিক গ্যাপ' বা ফাঁক তৈরি হয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে। এর ফলে আগামী দিনে রিখটার স্কেলে ৮ বা তার বেশি মাত্রার এক মহাবিপর্যয়কর ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনটি হলে তা কেবল পাহাড়ি অঞ্চলেই নয়, বরং সমতলের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ডেকে আনতে পারে। গত কয়েক দশকে হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে দ্রুত গলে যাচ্ছে হিমবাহগুলি। বরফ গলে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিমবাহ হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেক। সামান্য বৃষ্টিপাত বা ছোট ভূকম্পনেও এই হ্রদগুলির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে নিমেষে প্লাবিত হতে পারে নিচের উপত্যকাগুলি। কেদারনাথ বা সিকিমের লোনাক হ্রদ ফেটে ঘটা বিপর্যয়ের স্মৃতি আজও মানুষের মনে তাজা।
কেন বিপর্যয়ের মুখে দার্জিলিং?
ওয়েস্ট বেঙ্গল মিউনিসিপাল এক্ট অনুসারে, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে পরিকাঠামো নির্মাণের উচ্চতার সীমাবদ্ধতা ১১.৫ মিটারের বেশি নয়। কিন্তু দার্জিলিংয়ে এই নিয়ম ছাপিয়ে অবাধে মাথা চারা দিয়েছে বহুতল। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, তাদের একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যে দার্জিলিংয়ের ১৭ শতাংশ এলাকা মারাত্মক ভূমিধস প্রবণ। তিনধারিয়া, গিদ্দাপাহাড়, গয়াবাড়ি, পাগলাঝোরা, দারাগাঁও এই সমস্ত এলাকা গুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সমস্ত এলাকা গুলিতেই চাপ বেড়েছে পর্যটকদের। পরিবেশবিদদের কথায়, ১৭০ থেকে ১৫০ বছর আগেও পার বর্গ কিলোমিটারে ২৯ জনের বসবাস ছিল। সেই সংখ্যা এখন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০ জনে। দর্জিলিংকে বিপদে ফেলার জন্য এই জন বিস্ফোরণ অনেকাংশেই দায়ী। জনবসতি এবং পর্যটকের আনাগোনা বাড়তেই যত্রতত্র গজিয়ে উঠেছে বহুতল ও হোটেল, কোনো নিয়ম ছাড়াই। পার্বত্য এলাকায় থাকা স্লোপ, এখানকার বিল্ডিং নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ৩০-৬৫ ডিগ্রি স্লোপের উপরে কোনও রকম সয়েল টেস্ট ছাড়া, বেআইনি ভাবে গড়ে উঠছে বহুতল। আগেই বলা হয়েছে হিমালয় অঞ্চলের মাটি আলগা ও ঝুরঝুরে। শুধু দার্জিলিং নয়, উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ এলাকার মৃত্তিকা গড়ে উঠেছে কোয়ার্টজ, সেলস পাথরে। যুগ যুগ ধরে আবহবিকারের ফলে এই পাথর হয়ে যায় ঝুরঝুরে ও আলগা। কঠিন প্রস্তর না থাকার কারণে অধিকাংশ অঞ্চলই এই মাটির দ্বারা গঠিত। এই মাটিতে যে ধরণের নির্মাণ করা উচিত ছিল, সেখানে ইচ্ছেমত নির্মাণ, বা কংক্রিটের তৈরী রাস্তাঘাট মাটির ধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো ২০২৪ সালে তিস্তা ভয়ঙ্কর হয়ে গোটা উত্তরবঙ্গ বন্যা কবলিত হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নগরায়ন আর সভ্ভতার বিকাশ যতবার প্রকৃতিকে আঘাত করেছে, ততবার প্রকৃতি দশগুণ করে ফেরত দিয়ে গেছে। তিস্তা নদীর উপরে বাঁধ দিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন পাওয়ার প্রজেক্ট, জলবিদ্যুত বা নদীর থেকে অবাধে পাথর ও বোল্ডার উত্তলন, নদীর চরিত্র ও গতিপথকে পাল্টে দিয়েছে। ফলে বর্ষাকালের অতিবৃষ্টি বারবার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ডুয়ার্স-তরাই ও হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে। সেই সঙ্গে ভূমিকম্প প্রবণ এই হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল বার বার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উত্তরের। একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দার্জিলিংয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ নির্মিত এলাকা ভূমিকম্পের ফাটল বা চ্যুতির খুব কম থেকে মাঝারি দূরত্বের মধ্যে। ফলে ৭ বা তার বেশি তীব্রতার ভূমিকম্প ধসিয়ে দিতে পারে গোটা শহরটাকে। পর্যটন যত বেড়েছে, মানুষের পা যত লম্বা হয়েছে, সবুজ উধাও হয়েছে শৈলশহর থেকে। সবুজ কমে যাওয়া এবং বেআইনি নির্মাণ মাটির ভিতরে বৃষ্টির জল ঢোকার হার কমিয়ে দিয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে সরাসরি ঝরনার জলের উপরও, বদলেছে জলপ্রবাহের স্বাভাবিক চরিত্র। দার্জিলিং মূলত ঝরনা ও বৃষ্টির জলের উপর নির্ভরশীল। সরাসরি ব্যবহারের মতো কোনও বড় নদী বা ভূগর্ভস্থ জলের সহজলভ্য উৎস এই শহরের নেই। একদিকে পর্যটকের চাপ বৃদ্ধি অন্য দিকে পানীয় জলের উৎসের সংকুলান, তীব্র জলসঙ্কটের মুখে দাঁড় করিয়েছে দার্জিলিংকে।
পাহাড় ভালো নেই, ভালো নেই তার শরীর মন। আমরা নিজেদের স্বার্থে যত বার ভিড় জমিয়েছি পাহাড়ে, একটু একটু করে ক্ষয়ে গেছে তার শরীর। পূর্বে ব্রহ্মপুত্র থেকে পশ্চিমে সিন্ধু অববাহিকা, ১৩ টি রাজ্য, ২৫০০০ কিলোমিটার অঞ্চল ও পাঁচ কোটি মানুষের এই বসত এলাকা আজ ভয়াল বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০৪৮৫ টি হিমবাহ হ্রদের উপরে রিমোট সেন্সরিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি করে জানা গিয়েছে যে মোট ৫৬ টি হ্রদ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত সপ্তাহে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চল ভয়াবহ হিমবাহ ধসে বা গলে পরার কারণে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। ছাড় পাবেনা দার্জিলিং-ও। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কি রেখে যাচ্ছি মৃত্যু? হয়তো এখনও সময় আছে, সরকার, প্রশাসন এবং সর্বোপরি আমরা যদি সচতন হই, তাহলে প্রকৃতির উপরে এই যথেচ্ছাচার বন্ধ হবে। প্রকৃতিকে আপনি যা দেবেন সে ফিরিয়ে দেবে ১০০ গুণ। আর সেই ফেরত ডেকে আনবে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। আমরা যদি এখনও সাবধান না হই, তাহলে একটা জোশিমঠ বা একটা নেপাল বিপর্যয়ের মত ঘটনা চিরতরে মুছে ফেলবে সাধের শৈলরানী-কে।