মণি ভট্টাচার্য: বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা অনেক সময় হয় তরুণদের হাত ধরেই। কখনও তা ছাত্র আন্দোলন, কখনও দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন, কখনও আবার কর্মসংস্থান বা শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে কেন্দ্র করে। আজ দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে যেন সেই একই প্রশ্ন আবার সামনে চলে আসছে বাংলাদেশের পর কি এবার গোটা উপমহাদেশেই "জেন-জি" বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের যুগ শুরু হয়েছে?
বাংলাদেশে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত একটি প্রশাসনিক দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সেই সংকট দেশের ক্ষমতার কাঠামোকেই নাড়া দেয়। বাংলাদেশের ঘটনাটি শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট ছিল না; এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একটি বার্তা দিয়েছিল, সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত, দ্রুত যোগাযোগে অভ্যস্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নতুন প্রজন্মকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়।
শ্রীলঙ্কার ঘটনাও একইভাবে স্মরণীয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ একসময় "আরাগালায়া" আন্দোলনের জন্ম দেয়। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল মূলত তরুণ প্রজন্ম। শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে রাষ্ট্রপতিকেই দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় এ এক নজিরবিহীন ঘটনা।
নেপালেও গত কয়েক বছরে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে একাধিক বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। যদিও সেখানে সরকার পরিবর্তনের পেছনে সংসদীয় সমীকরণ বড় ভূমিকা নিয়েছে, তবু সামাজিক মাধ্যমনির্ভর তরুণদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিও স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ তৈরি হয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সিবিআই তদন্তের দাবি ওঠে। দিল্লি-সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়। কোথাও কোথাও পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং লাঠিচার্জের অভিযোগও ওঠে। এই ঘটনাগুলি অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষককে বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার প্রাথমিক পর্যায়ের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
তবে এখানেই একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। এখানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, সংসদ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এখনও রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফলে প্রতিবাদ এবং সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক। তবুও সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। কারণ বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও মুহূর্তের মধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লক্ষ লক্ষ মানুষকে একত্রিত করতে পারে। এই প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত জনসমালোচনার মুখে পড়ে।
অন্যদিকে, সরকারপক্ষের একাংশের দাবি এই ধরনের আন্দোলনের পিছনে বিদেশি অর্থ, আন্তর্জাতিক স্বার্থগোষ্ঠী কিংবা তথাকথিত "ডিপ স্টেট"-এর প্রভাব থাকতে পারে। এই অভিযোগ নতুন নয়। বিশ্বের বহু দেশেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এই দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে এমন কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ সামনে আসেনি, যা নিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এই পরিস্থিতে প্রশ্ন হল, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কি একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে? সম্ভবত উত্তরটি হ্যাঁ।
কিন্তু সেই অধ্যায়ের নাম শুধুমাত্র "জেন-জি আন্দোলন" নয়; বরং ডিজিটাল যুগের জনমত। আজ একটি মোবাইল ফোন, একটি ভাইরাল ভিডিও কিংবা একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট কখনও কখনও হাজার রাজনৈতিক সভার থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতা সরকার, বিরোধী দল এবং প্রশাসন সকলকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ইতিহাসের শিক্ষা একটাই, যে সরকার মানুষের ক্ষোভকে শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে, তারা শেষ পর্যন্ত সমস্যার মূল কারণকে উপেক্ষা করে। আবার যে আন্দোলন শুধুমাত্র আবেগে পরিচালিত হয়, তারও স্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্য আসে না।
দক্ষিণ এশিয়া আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তরুণদের কণ্ঠস্বরকে দমন নয়, শুনতে হবে। একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান জরুরি। বাংলাদেশ থেকে দিল্লি—এই ঘটনাগুলি হয়তো আলাদা আলাদা দেশের আলাদা বাস্তবতা। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: নতুন প্রজন্ম এখন আর শুধু ভবিষ্যতের ভোটার নয়, বর্তমানের রাজনৈতিক শক্তি। আর সেই শক্তিকে অবহেলা করার মূল্য ইতিহাসে বারবার চুকিয়েছে বহু সরকার।