মণি ভট্টাচার্য: "মানুষ থেকেই মানুষ আসে, বিরোধিতার ভিড় বাড়ায়, আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ, তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।" কবি শ্রীজাতর এই লাইনটির সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির সম্পর্ক বড়ই একান্ত। তফাৎ কেবল শিরদাঁড়ায়।...
মণি ভট্টাচার্য: "মানুষ থেকেই মানুষ আসে, বিরোধিতার ভিড় বাড়ায়, আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ, তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।" কবি শ্রীজাতর এই লাইনটির সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির সম্পর্ক বড়ই একান্ত। তফাৎ কেবল শিরদাঁড়ায়। রাজ্যে হওয়া বারুইপুরের মত নৃসংশ ঘটনা যেন সেই তফাৎতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। একসময় রাজ্যে ধর্ষণের ঘটনার পাল্টা দোষীদের সাজা দেওয়ার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রীর গলায় শোনা যেত ছোট ঘটনা, এমনকি কোনও ঘটনায় নির্যাতিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী? আজ শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, পরিবার যে বিচার চায় সেটাই হবে। এমনকি তিনি জানিয়েছেন, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে অপরাধীর।
বারুইপুরের ১২ বছরের নাবালিকার মৃত্যু শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নৃশংস ঘটনা। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হল দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেফতার এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। সেই দিক থেকে ঘটনাটির পর রাজ্য সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলতেই হবে। ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন। বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়, এসটিএফ-সহ একাধিক তদন্তকারী সংস্থা অভিযানে নামে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একে একে পাঁচজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত এখনও চলছে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপ তদন্তের গতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
শুধু প্রশাসনিক নির্দেশেই থেমে থাকেননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নিজে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমবেদনা জানান এবং তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। পরিবারের সদস্যদের ভবানীভবনে ডেকে তাঁদের বক্তব্য শোনার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। শোকাহত পরিবারের সঙ্গে সরকারের এই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ প্রশাসনের মানবিক দিককেও সামনে এনেছে। পরিবারও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর দ্রুত পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বলে জানা গিয়েছে।
এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর আরেকটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই মামলায় দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে 'ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট', অর্থাৎ সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করা হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, অপরাধীর ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের চোখে একমাত্র অপরাধই বিচার্য হবে। এমন বার্তা সমাজে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে নির্যাতিতার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেতেই, ওই ঘটনায় ধর্ষণ-গনধর্ষনের মত একাধিক ধারা যুক্ত করল পুলিশ। যেমন ধারা ৬৫– ধর্ষণ ধারা ৭০(২)– গণধর্ষণ ধারা ১০৩(১)- খুন ধারা ২৩৮– তথ্য-প্রমাণ লোপাট ধারা ৬১– অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র পকসো আইনের ধারা ৬ ধারা ১৩৭(২) ও ১৪০(২)– নাবালিকাকে অপহরণ। এখানেই শেষ নয়, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু সাফ জানিয়েছেন গতকালের ঘটনায় একইসঙ্গে যে গণপিটুনি, রেল অবরোধ ও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলিরও নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু হয়েছে, ৪টি পৃথক মামলার রুজু করে সেই ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক পরিসরেও তুলনা শুরু হয়েছে পূর্ববর্তী প্রশাসনের ভূমিকার সঙ্গে। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, অতীতে এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনায় অনেক সময় সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপকে অনেকেই ভিন্ন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বারুইপুরে যেতে চাইলে যে কোনও রাজনৈতিক দল আইন মেনে ঘটনাস্থলে যেতে পারবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঘটনাস্থল পরিদর্শন বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করা স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার। সেই অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার বার্তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বলেই বিবেচিত হতে পারে।
অথচ ইতিহাস বলছে, সন্দেশখালি কিংবা হাঁসখালি, কোনও ক্ষেত্রেই তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সহজে যেতে পারেননি, এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে যেতে হাইকোর্টে ছুটতে হয়েছিল তাঁকে। ফলে সব মিলিয়ে সরকার গোড়ার ২মাসের মধ্যেই যেমন পরিষ্কার হয়েছে প্রাক্তন ও বর্তমানের তফাৎটা, ঠিক তেমনই শিরদাঁড়ার তফাৎটা যেন আকাশ এবং পাতাল, তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার এবং খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।