মণি ভট্টাচার্য: একটা রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভালো, তার মাপকাঠি শুধু নতুন হাসপাতাল বা আধুনিক যন্ত্র নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন মাঝরাতে একজন মন্ত্রী হঠাৎ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকে জানতে চান, ডাক্তার ডিউটিতে আছেন কি না, রোগী ওষুধ পাচ্ছেন কি না, আর একজন গরিব মানুষ চিকিৎসার অভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না। পশ্চিমবঙ্গের নতুন স্বাস্থ্যনীতি সেই জবাবদিহির সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলেই মনে হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় একের পর এক আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। জেলা হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কোথাও আগাম বার্তা নয়, সরাসরি হাজির হয়ে তিনি পরিষেবা, ওষুধের মজুত, চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন।
রাতের হানা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলার সরকারি হাসপাতাল নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, রাত নামলেই কমে যায় পরিষেবার মান। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকা, রোগীকে অকারণে রেফার করা, ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হওয়া এসব অভিযোগ নতুন নয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের সবচেয়ে বড় বার্তা হল, সরকার নিজেই নিজের ব্যবস্থাকে যাচাই করছে। প্রশাসনের কাছে এটি শুধু নজরদারি নয়, কর্মীদের কাছে স্পষ্ট সতর্কবার্তা, গাফিলতি আর আড়ালে থাকবে না।
গরিবের জন্য ১০% বেড: নীতির কেন্দ্রবিন্দু
সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলির একটি হল সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে ১০ শতাংশ ইনডোর বেড এবং ২০ শতাংশ আউটডোর পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার নির্দেশ। স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, শুধু বেড নয় অস্ত্রোপচার, ওষুধ, কনসালটেশন, বেড চার্জ-সহ চিকিৎসার সমস্ত খরচই এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ বাংলায় বহু পরিবার আজও একটি বড় অসুখের খরচ সামলাতে গিয়ে ঋণে ডুবে যায়। সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসার ফারাক কমিয়ে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়াই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
‘রেফার’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সবচেয়ে বিতর্কিত শব্দগুলির একটি রেফার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না করেই এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। নতুন স্বাস্থ্য প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, যথাযথ চিকিৎসার চেষ্টা না করে রোগীকে রেফার করা চলবে না। প্রতিটি হাসপাতালকে তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে এবং অকারণ রেফারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে রোগীর ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি জরুরি চিকিৎসার ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বাঁচানোর সম্ভাবনাও বাড়বে।
আরজি করের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা
আরজি কর-কাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়; সেটি বাংলার স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার উপরও বড় আঘাত ছিল। অভিযোগ উঠেছিল গাফিলতি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার। সেই স্মৃতি এখনও তাজা। এই কারণেই বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য অবস্থান রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বারবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে বলেছেন, কোনও গাফিলতি ধামাচাপা দেওয়া হবে না; সমস্যা থাকলে তা সামনে এনে সমাধান করতে হবে। সমালোচকদের মতে এটি ইমেজ পুনর্গঠনের চেষ্টা, আর সমর্থকদের মতে এটি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার।
শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা
স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের ইতিহাস বলছে, সবচেয়ে কঠিন কাজ নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়—সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন। ১০% ফ্রি বেড সত্যিই কি গরিব রোগী পাবেন? রাতের হাসপাতাল কি নিয়মিত একই মান বজায় রাখবে? রেফার সংস্কৃতি কি সত্যিই কমবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবে আগামী কয়েক মাস। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন, নতুন স্বাস্থ্য প্রশাসন অন্তত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: হাসপাতাল আর শুধু ভবন নয়, এটি জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান। যদি এই নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং দরিদ্রবান্ধব নীতিগুলি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে বহুদিনের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিই ‘স্বাস্থ্যের বাংলা’ গড়ার পথে পশ্চিমবঙ্গ এগোতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে একটাই বিষয়ের উপর আইন ও নীতির মতোই চিকিৎসার অধিকারও যেন সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়।