দেশের মুখ্য নির্বচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার রবিবার রাতে বাংলার মাটি ছোঁয়ার পর সোমবার সকালে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দেবেন। এবং তারপর ম্যারাথন বৈঠকে বসবেন। এমতাবস্থায়, কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন কি? রবিবার এই প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের ইঙ্গিতপূর্ণ উত্তর, "আমরা সবসময়েই প্রস্তুত থাকি"।
পরের প্রশ্ন, সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ হবে কি? উত্তর, "নিশ্চয় হবে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আছে। মনোনয়নের শেষ দিন অবধি তালিকায় নাম উঠবে"।
কতদিন অন্তর সাপ্পিমেন্টারি তালিকা বেরোবে? উত্তর, "কমিটি ঠিক করবে (কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি যে কমিটি তৈরি করে দিয়েছিলেন) "।
৭ মে-র মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে রাজ্যে। নইলে রাষ্ট্রপতি শাসন। ওই সময়সীমার মধ্যে কি ভোট হবে? রাষ্ট্রপতি শাসন প্রসঙ্গে কিছু না-বলে তাঁর অতি সংক্ষিপ্ত ও অতি ইঙ্গিতপূর্ণ উত্তর, "ভোট কেন হবে না"?
ভোট না রাষ্ট্রপতি শাসন?
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) ৬০ লক্ষের ভোটভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে যায়। পরেরদিন, রবিবার বিকেলে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করে ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীনের ভোট-ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক কষে অভিষেকের বক্তব্য, "বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বা বিচারকেরাও তো মানুষ। তাঁদের কাছে তো কোনও জাদুকাঠি নেই। অথবা সফটওয়ার নেই। ৬০ লক্ষ নাম বিবেচনাধীন। খুব বেশি হলে ৫০০ জন বিচারক কাজ করছেন। প্রতিদিনে যদি ২০ থেকে ৩০ টি নাম নিয়ে নিষ্পত্তি করেন, তাহলে খুব বেশি হলে দিনে ১০ থেকে ১৫ হাজার নিষ্পত্তি করা যাবে। আমি না-হয় ২০ হাজার ধরে নিলাম। তাহলে ৬০ লক্ষ নাম নিষ্পত্তি করতে কত সময় লাগবে? নেই-নেই করে ৪ মাস। মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন লেগে যাবে। তাহলে নির্বাচন হবে কী করে? মে মাসের ৫ তারিখের মধ্যে যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়, তাহলে মার্চের ২০ তারিখের মধ্যে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করতে হবে। আজ ১ তারিখ। ২০ দিনের মধ্যে কি ৬০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি সম্ভব?"
বর্ষীয়ান বামনেতা বিমান বসুর বক্তব্যও প্রায় একইরকম। কমিশন দফতরের অদূরে বামদের রাতদখলের দাবি, ৬০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত ভোট করা যাবে না। একটি মিনিডোরের উপর অশীতিপর-যুবক বিমান বসু বলেন, "৬০ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হবে? আমরা বলছি হবে না। ভোটারদের বাদ দিয়ে ভোট হবে না। তখন উনি (রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক) বললেন, এদের মধ্যে ৬ লক্ষ প্রায় নিষ্পত্তি হওয়ার মুখে। আমরা বললাম, ৬০ লক্ষের মধ্যে ৬ লক্ষ তো নস্যি। তাহলে বাকিদের নাম নিষ্পত্তি করতে কতদিন লাগবে? যাঁর বাবা-মা ভোটার, তাঁর ছেলে কী করে বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) থাকে? উনি বললেন, কোনও কোনও বিএলও, ইআরও, ডিইও-রা কিছু সমস্যা তৈরি করেছেন। সবাই নন। কেউ কেউ। আমি প্রশ্ন করলাম, তখন পদক্ষেপ করেননি কেন? উনি বললেন, উনি পদক্ষেপ করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাইরে কয়েকশো বিএলও বিক্ষোভ করছেন, দিনে, রাতে, তাহলে কাজটা কী করে হল? উনি বললেন, ওঁদের মধ্যে মাত্র ৫ জন বিএলও"!
কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর স্পষ্ট কথা, "যতজন বিচারক লাগে লাগুক। কিন্তু ৬০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি না-করে ভোট ঘোষণা করা চলবে না। তাঁরা ভোট দিতে পারছেন না তাঁদের ভুলে নয়, এই ব্যবস্থার ভুলে। কোথায় বানান ভুল, তাতে তাঁরা কী করবে? সমস্যা হলে তাঁদের বাড়ি-বাড়ি যাক কমিশনের প্রতিনিধিরা, দরকার হলে আরও সময় নিক কমিশন। কোনও অবস্থাতেই বাংলার মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, ভোটদানের অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না"।
এমতাবস্থায়, হয় ৬০ লক্ষ নামের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ভোট ঘোষণা করতে হবে। নয়তো, বিজেপি বাদে রাজ্যের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের দাবি নস্যাৎ করে ছাব্বিশের বিধানসভার নির্ঘণ্ট ঘোষণা করবেন জ্ঞানেশ কুমার, কলকাতা থেকে দিল্লিতে ফিরে গিয়ে।