তৃণমূল থেকে তিনি বিজেপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন সম্প্রতি। এদিন সেই টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ বিজেপির 'ব্যানারে' এক সাংবাদিক বৈঠক থেকে বললেন, "বাংলাকে বৃদ্ধাশ্রম বানাতে চাই না। বাংলা থেকে তরুণ প্রজন্মের 'ব্রেনড্রেন' আর হতে দিতে চাই না"। এবং, ভোটের বাজারে তা নিয়ে শুরু হল বিতর্ক। তৃণমূল নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারের কটাক্ষ, "উনি নিজেই তো ব্রেনড্রেনের আদর্শ দৃষ্টান্ত"।
কলকাতা কি আজ বৃদ্ধাশ্রম?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ-কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একদা যে-কলকাতা থেকে ছাত্রযুবরা পথে নেমেছে, রাজপথে পুলিসের গুলিতে নিহত হয়েছে, দুরন্ত কেরিয়ার ফেলে নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, সেই কলকাতা কিন্তু আজ বৃদ্ধাশ্রমের পরিণত হয়েছে। কারণ, তরুণ রক্ত আর টগবগ করে ফোটে না এখানে। প্রেসিডেন্সি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা পেলেও তার মান আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। প্রেসিডেন্সি তার গৌরব হারিয়েছে। টিমটিম করে জ্বলছে শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, রাজনীতি হোক কি কেরিয়ার তৈরি, কোনও কিছুতেই আর তরুণ রক্ত টগবগ করে ফোটে না কলকাতায়। বলা ভালো, শুধু কলকাতাই নয়, বাংলার তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশই আজ বাংলার বাইরে। মেধাবীরা ভিনরাজ্যে তথা ভিনদেশে উচ্চপদে কর্মরত। উচ্চশিক্ষার জন্যও তরুণ প্রজন্ম বাংলা ছাড়ছে। শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছে, এর কারণ হল, উচ্চশিক্ষায় কাজের সেই পরিবেশই আর নেই। গবেষণার সেই পরিবেশ আর নেই। তাই, সেখানে পড়ুয়ারা পড়াশোনায় আগ্রহী হচ্ছে না আগের মতো। এবং, পড়াশোনা করে সেই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-অধ্যাপক হয়ে পড়ানোর ইচ্ছেও আর দেখা যাচ্ছে না সেভাবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলির মাথায় সর্বত্র রাজনৈতিক নিয়োগ। সম্প্রতি আইএসএফ-এর বিদায়ী বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি প্রশ্ন তোলেন, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে (নির্দিষ্ট করে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে) কোর্ট সদস্য হিসেবে কেন তৃণমূল নেতা সওকত মোল্লার নাম রয়েছে?
রাজ্যের শিক্ষামহল বলছে, বাম আমলে উচ্চ শিক্ষায় অনিলায়নের অভিযোগ উঠেছে বারংবার, এ কথা ঠিকই। তবু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মান পড়ে গিয়েছে, প্রেসিডেন্সিতে পড়ার আগ্রহ কমে গিয়েছে, শিক্ষক-অধ্যাপক হিসেবে রাজ্যের সারস্বত প্রতিষ্ঠানগুলিতে চাকরিতে যোগ দেওয়ার অভিপ্রায় হারিয়ে গিয়েছে, এমনটা বোধহয় কট্টর বাম-বিরোধীরাও দাবি করতে পারবেন না।
এমতাবস্থায়, একদিকে মেধাবীরা রাজ্য ছাড়ছেন দলে-দলে। অন্যদিকে, কম মেধার মানুষজন পেটের দায়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে। এমতাবস্থায়, লিয়েন্ডার পেজের মন্তব্যে রাজনীতি থাকলেও তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, "প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, বাংলাকে বৃদ্ধাশ্রম বানাতে চাই না, যুবকদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাই। ব্রেনড্রেন (দেশ ছেড়ে ভিনদেশে প্রতিভা) হতে দেবো না"।
'লিয়েন্ডার নিজেই ব্রেনড্রেনের দৃষ্টান্ত'
তৃণমূল নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারের পাল্টা প্রশ্ন, "আচ্ছা বলুন তো গত ১০ বছরে তিনি বাংলার জন্য কী করেছেন? আচ্ছা, বাংলার সাধারণ যুবক-যুবতীর কথা ছেড়ে দিলাম। বাংলাতে বিনিয়োগ আনার জন্য কিছু কাজ করেছেন কি? বাংলার খেলাধুলোর জন্য কী করেছেন? কিচ্ছু করেননি। আচ্ছা তিনি থাকেন কোথায়? তাঁর অফিসিয়াল রেসিডেন্স মুম্বইতে। তার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আজ তিনিই বলছেন, ব্রেনড্রেন হতে দেবো না"!
প্রশ্ন রয়ে গেল
কলকাতা তথা বাংলা আজ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে, এ-কথা স্বীকার করেও শিক্ষাবিদরা প্রশ্ন তুলছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে কি সেই হৃতগৌরব উদ্ধার হবে? দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পুণের ফিল্ম ইনস্টিট্যুট, সর্বত্র তো হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির লোকজনই প্রতিষ্ঠানের মাথায় রয়েছেন। এবং, প্রতিবাদ করলেই: 'টুকরে-টুকরে গ্যাং'।
এই বিতর্কের মাঝেই, রাজনৈতিক মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে, কয়েকবছর আগে গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচনের মুখে তৃণমূলে যোগ দেন লিয়েন্ডার পেজ।