বাংলার 'ভোট কালচার' যে এবার পাল্টাবে তার আগাম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তের কথায়। কালীঘাট থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, "(ভোট) কালচার মানে কি বিজেপির ডান্স করা? উনি (সুব্রত গুপ্ত) এখানকার কালচার কী চেঞ্জ করবেন? বেঙ্গলের কালচার, বাংলার কালচার, বাংলাতেই থাকবে। উনি নিজের কালচার ঠিক করুন আগে"।
এদিন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে যখন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে বাংরবার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তার উত্তরে তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন: ভোট এবার অন্যরকম হবে।
কীরকম ভোট হবে এবার?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানান, বুথের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের হাতে। তাই ইভিএমে সেলোটেপ (হামেশাই যে-অভিযোগ ওঠে), ওয়েবকাস্টিং ক্যামেরায় চুইংগাম লাগানো সহজ হবে না"। বাহিনীকে তো পুলিস নিয়ন্ত্রণ করবে, তাহলে? এবার আরও স্পষ্ট উত্তর, "পুলিসের কাজ হবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সহায়তা করা। বুথের নিয়ন্ত্রণ আর পুলিসের হাতে থাকবে না। যাঁরা সীমান্তে সর্বদা পাহারা দিচ্ছেন, সেই জওয়ানদের কাছে একটা বুথ নিয়ন্ত্রণ করা কোনও ব্যাপারই নয়"।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অনেক বুথে ইভিএমে এমনভাবে সেলোটেপ লাগিয়ে রাখা হয়, যাতে করে বিরোধী প্রার্থীর প্রতীকে বোতাম টেপাই সম্ভব না হয়। এবং, একমাত্র শাসকদলের বোতাম টেপার সুযোগ থাকে। এমতাবস্থায়, যদি কেউ সেই বোতাম না-টেপেন, তাহলে সেই ভোটারকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সহজ হয়। এবং, জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদের ক-জনই বা যেতে চান।
এছাড়া, বুথের ভিতর যে ক্যামেরা থাকে, যার মাধ্যমে ওয়েব কাস্টিং হয়, সেই ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে রাখার অভিযোগ আসে আকছার। এমনকি, সেই ক্যামেরা বেশ কিছুক্ষণের জন্য বিকল করে দেওয়ার অভিযোগও কম নয়। এছাড়া চুইংগাম তো রয়েইছে। তবে এবার যে এগুলোর কোনওটাই হবে না, সুব্রত গুপ্তকে পাশে বসিয়ে তা একেবারে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল।
জ্ঞানেশ-বার্তা
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জ্ঞানেশ কুমারের দাওয়াই ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। ভোট ঘোষণার অনেক আগে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছে। ওই বাহিনীকে যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে কমিশন। দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।
উপসংহার
সূত্রের খবর, বাংলার 'ভোট কালচার' অন্যরকম করতে জ্ঞানেশ কুমার গাণ্ডিব তুলে দিচ্ছেন সুব্রত গুপ্তের হাতেই। আমলা মহলে যাঁর সততা প্রশ্নাতীত। এবং, দক্ষতাও।