মণি ভট্টাচার্য: শুধু হিসাবের খাতা নয়, ভবিষ্যতের পশ্চিমবঙ্গ কেমন হবে— তারই এক বিস্তৃত নকশা তুলে ধরল রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে একদিকে যেমন কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনই নারীকল্যাণ, শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও একাধিক বড় প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
এই বাজেটের অন্যতম ভিত্তি গ্রাম এবং কৃষি। কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে ৮,৫৬৫ কোটিরও বেশি টাকা। কৃষি বিপণন, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বরাদ্দগুলির মধ্যে রয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন, যেখানে খরচ করা হবে ৫১ হাজার ৮৩৬ কোটিরও বেশি টাকা। অর্থাৎ, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে গ্রামের মানুষ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি। এই বাজেটের আরেকটি বড় দিক হল মহিলাদের জন্য একাধিক নতুন উদ্যোগ। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের স্কুলছুট রোধ করতে সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজের অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্যই বরাদ্দ হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়াও, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ২১ হাজার কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মহিলাদের আর্থিক স্বস্তি দিতে বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালিয়ে যেতে ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা রয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা এই বাজেটের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে সরকার। সুন্দরবনের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা, হুগলি-ভাগীরথী নদীর উপর জেটি ও গ্রামীণ বাজার সংযোগ বৃদ্ধিতে ১০০ কোটি টাকা এবং মুড়িগঙ্গার উপর সেতু নির্মাণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। নদী ও দ্বীপাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করাই এর মূল লক্ষ্য।
উত্তরবঙ্গ এবং সুন্দরবন— রাজ্যের দুই ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের জন্যও রয়েছে বিশেষ বরাদ্দ। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে ১,৮২১ কোটি টাকার বেশি এবং সুন্দরবন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে ১,২৮০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলগুলিকে উন্নয়নের মূলস্রোতে নিয়ে আসাই সরকারের লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যজুড়ে আদর্শ স্কুল গঠনের জন্য ২,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঝাড়গ্রামে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার জন্য প্রথম ধাপে বরাদ্দ হয়েছে ১০ কোটি টাকা।
শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সরকার ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য এবং শিল্পোদ্যোগের জন্য ৩,২৬৬ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আবাস যোজনা (গ্রামীণ)-এ ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্পে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পরিষেবার আধুনিকীকরণেও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি থানায় জরুরি পরিষেবার জন্য নতুন গাড়ি চালু করতে ১০০ কোটি টাকা এবং রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই বাজেট শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। কৃষক, মহিলা, ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, আদিবাসী, সংখ্যালঘু— সমাজের প্রায় প্রতিটি অংশকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছে এই বাজেট। সংখ্যার নিরিখে যেমন এটি বড়, তেমনই উন্নয়নের পরিসরেও এটি একটি বিস্তৃত রূপরেখা, যা আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলার দাবি করছে।