পরীক্ষার আগে 'লাস্ট মিনিট সাজেশন'? বিধানসভার আগে 'লাস্ট মিনিট সাজেশন'? পর্যবেক্ষকরা অন্তত তেমনটাই মনে করছেন। এবং প্রশ্ন তুলছেন, সিএএ-তে আবেদন করে মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এখনও নাগরিকত্ব পায়নি। সেই কারণে তাদের নাম ওঠেনি চূড়ান্ত তালিকায়। এদিকে, বিজেপি নেতাদের পরামর্শে সিএএ-তে আবেদন করে মতুয়াদের একটা বড় অংশ কার্যত নিজেরাই ঘোষণা করেছে, তারা এ-দেশের নাগরিক নয়, তাই নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। এমতাবস্থায়, মালদহের গাজোলের এক প্রবীণ দম্পতি 'নাগরিকত্ব' পেল এবং বিজেপি বিধায়ক বাড়ি বয়ে এসে সেই শংসাপত্র ওই দম্পতির হাতে তুলে দিলেন। এবং সংবাদমাধ্যমকে বাইট দিয়ে সিএএ-র গুণাবলীর বর্ণনা দিলেন বিশদে।
নাগরিক?
গাজোলের শংকরপুর এলাকার মহেন্দ্রকুমার সিংহ ও তাঁর স্ত্রী আরতি সিংহ সিএএ-তে আবেদন করে 'নাগরিক' হলেন। এবং, আবেদন করার ৩ মধ্যে নাগরিকত্বরে শংসাপত্র পেয়ে মোদীজি-কে ধন্যবাদ জানালেন তাঁরা। একদা, বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁরা৷ অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও এতদিন তাঁরা এ দেশের নাগরিকত্ব পাননি৷ ছিল না ভোটার কার্ডও৷ এসআইআর শুরু হওয়ার পর সিএএ-শিবিরের দ্বারস্থ হন তাঁরা। তারপর ফর্ম ভরে যা-যা করণীয় তা-তা করে তিনমাসের মাথায় তাঁরা নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেলেন।
বিজেপি বিধায়ক
দোলপূর্ণিমার দিন ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়ি গিয়ে নাগরিত্বের শংসাপত্র তুলে দিলেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক চিন্ময় দেববর্মণ৷ যদিও প্রশ্ন উঠল, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শংসাপত্র কি এভাবে জনপ্রতিনিধির হাত দিয়ে পাঠানো যায়? এবং জনপ্রতিনিধি সেই শংসাপত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়ে নিজের দলীয় নেতৃত্বের জয়গান গাইতে পারেন কি?
'নাগরিক' হয়ে মহেন্দ্র কুমার সিংহ জানান, "বাংলাদেশের টাঙ্গাই মীরজাফর এলাকায় বাড়ি ছিল। সেখানে আর থাকতে না-পেরে ১৯৯৩ সালে ভারতে এসেছিলাম। তারপর কেটে গিয়েছে তিরিশ বছর। এসআইআর শুরু হওয়ার পর আগে সিএএ আবেদন করেছিলাম। অনেক চিন্তার মধ্যে ছিলাম। ঘুম হতো না। ভয় লাগতো। আজকে আমি খুবই খুশি। এ কথা বলতেই পারি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহজি যেটা বলেন সেটা করেন"।
গাজোলের বিজেপি বিধায়ক চিন্ময়দেব বর্মণ ওই দম্পতির পাশে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে দাবি করেন, "রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল শরণার্থী উদ্বাস্তুদের ভুল বুঝাচ্ছে । রাজনীতির সুবিধার্থে এই তৃণমূল মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। হিন্দুদের মধ্যে যারা এ দেশে শরণার্থী হিসেবে বাস করে আসছিল এতদিন ধরে, তাদের সবাইকেই সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়া হবে । আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। সিএএ আবেদন করুন। অবশ্যই ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন"।
তৃণমূল পরিচালিত গাজোল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও তৃণমূল নেতা মোজাম্মেল হোসেনের কটাক্ষ, "বিজেপি বিধায়ক সস্তার রাজনীতি করছেন। মিষ্টি খাইয়ে ফুলের মালা পরিয়ে নিজেকে হাইলাইট করার চেষ্টা করছেন । আজকে এক দম্পতি নাগরিকত্বের শংসাপত্র সার্টিফিকেট পেল ঠিকই। কিন্তু গাজোলের অনেক পরিবার রয়েছে, যারা সিএএ-তে আবেদন করে এখনও শংসাপত্র পায়নি। বিধায়ক শুধু অভিনয় করে দু-জনকে শংসাপত্র দিচ্ছেন। বাদবাকিরা কবে পাবেন, কোনও উত্তর নেই"।
'লাস্ট মিনিট সাজেশন'?
পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, সিএএ-তে আবেদন করে যাঁরা নাগরিকত্ব পাননি এখনও পর্যন্ত, চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠেনি, এমনকি, ভোটের আগে সেই নাম আদৌ উঠবে কি না, তা নিয়ে মতুয়া-শিবির বিজেপির প্রতি রীতিমতো ক্ষুণ্ণ। সিএএ-র আবেদন খতিয়ে দেখে নাগরিকত্ব দিতে নতুন বছরের গোড়ায় বিশেষ আধিকারিক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার। মতুয়াদের কথা ভেবে, ভোটমুখী বাংলার কথা ভেবে। কিন্তু, তাতেও বিশেষ লাভ হয়নি। এখন, একেবারে শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রের মোদী সরকার আরও আধিকারিক নিয়োগ করে আরও দ্রুত সিএএ সংক্রান্ত আবেদনের নিষ্পত্তি করতে চাইছে। কিন্তু, বিধানসভার ভোট দুয়ারে এসে যখন চৌকাঠ পেরিয়ে প্রায় ঘরে ঢুকে পড়েছে, তখন 'লাস্ট মিনিট সাজেশন' কতটা কাজে দেবে, তা নিয়ে সংশয় পর্যবেক্ষকরা।