স্বাধীনতার পর বাংলার রাজনীতিতে ধর্মতলা হয়ে উঠেছে 'রণক্ষেত্র রাজপথ'। বিধান রায়ের সময়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ধর্মতলা। উদ্বাস্তু আন্দোলন, স্কুল শিক্ষকদের আন্দোলন, খাদ্য ...
স্বাধীনতার পর বাংলার রাজনীতিতে ধর্মতলা হয়ে উঠেছে 'রণক্ষেত্র রাজপথ'। বিধান রায়ের সময়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ধর্মতলা। উদ্বাস্তু আন্দোলন, স্কুল শিক্ষকদের আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, একের-পর-এক দুর্গম পথ পেরিয়ে আজও ধর্মতলার পথ চিরহরিৎ বৃক্ষের মতোই চিরসবুজ। একদা, ক্ষমতায় আসার আগে এই বৃক্ষের কাছে বারংবার আশ্রয় নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামজমানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবিসংবাদী বিরোধী নেত্রী করে তুলেছিল এই ধর্মতলার মোড়। যুব কংগ্রেসের রাশ তাঁর হাতে যাওয়ার পর একুশে জুলাই মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। যে-অভিযানে পুলিসের গুলিতে ১৩ জন নিহত হন। এবং, উদ্ধত বেয়নেটের মুখ থেকেও মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ফিরে আসেন তিনি। কলকাতা পুলিসের এক অধস্তন কর্মী, তাঁর ঊর্ধ্বতনের বিরুদ্ধে বন্দুক তাক করার সাহস না-দেখালে, সেদিন তাঁর মৃত্যু অনিবার্য ছিল বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। দেড় দশক বাদে, সিঙ্গুরে জোরজবরদস্তি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে এই ধর্মতলায় 'ঐতিহাসিক' ২৬ দিনের অনশনে বসেন তৃণমূল নেত্রী। এবং জমি আন্দোলনের গর্ভগৃহ হয়ে ওঠে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ৩৪ বছরের বাম-সূর্য বাংলার রাজনৈতিক দিগন্তরেখায় অস্তমিত হয়।
সঙ্কটকালে এবারও সেই ধর্মতলা
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, টানা ১৫ বছর রাজ্য শাসনের পর এবার এক বড় সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একুশের বিধানসভায় বাংলায় নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের অশ্বমেধের রথ রুখে দিয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু, ছাব্বিশে সঙ্কট অন্য জায়গায়। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলায় এসআইআর শুরুর আগে থেকে এখন অবধি হিসেব করলে একাধিক শ্রেণি বা ক্যাটেগরিতে 'বাদ' পড়েছে ৬৩ লক্ষ নাম। এছাড়া আরও ৬০ লক্ষ নাম বিবেচনাধীন ( UNDER ADJUDICATION)! এই পরিস্থিতিতে, আসন্ন ছাব্বিশের বিধানসভায় যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বিরোধী দল বিজেপি। এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়েছে পর্যবেক্ষকদের। বাদ অথবা বিবেচনাধীনের একটা বড় অংশই হয় সংখ্যালঘু, নয়তো মহিলা ভোটার। একুশে ঘরের লক্ষ্মীরা দু-হাত উপুর করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছিলেন। এবং, ধর্মীয় মেরুকরণের সমীকরণে মুসলিমরা আরও বেশি করে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন।
এমতাবস্থায়, বিজেপি বাদে বাম-কংগ্রেসের মতো বিরোধী দল স্পষ্ট জানিয়েছে তাদের অবস্থান, ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তি না-করে বিধানসভা ভোটের দিন ঘোষণা করা চলবে না। এবং, একই দাবি শাসক তৃণমূলেরও। এই পরিস্থিতিতে, 'ভোটরক্ষা'য় ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্য়্যায়ের ধর্না নির্বাচন কমিশনের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সে ক্ষেত্রে ৬০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি করে বাংলায় ভোট ঘোষণা হতে পারে। এবং রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ৭ মে-র মধ্যে নতুন সরকার গঠন না-করলে সাংবিধানিক রীতিনীতি অনুযায়ী আপনা থেকেই সরকার 'পড়ে যায়'। এই পরিস্থিতিতে, তাঁর সরকারকে গায়ের জোরে ফেলে দিতেই বিজেপির কথায় কমিশনের এই এসআইআর-এর চক্রান্ত বলে দাবি করবেন তৃণমূল নেত্রী। এবং, সে ক্ষেত্রে সহানুভূতির হাওয়ায় তৃণমূল-বিরোধী ভোট ফের তৃণমূল-মুখী হয়ে উঠতে পারে। অন্তত তেমনটাই মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশ।
দেখাই যাক। ধর্মতলা তাঁকে কখনও খালি হাতে ফেরায়নি। সঙ্কটকালে এই ধর্মতলা তাঁকে মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরিয়ে এনেছে।