বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যখন শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী, তখন কালীঘাটের কুটিরে যৎসামান্য উপকরণ নিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং, অবশ্যই, কিঞ্চিৎ ভাষণও দিলেন ( যা তাঁর স্বভাবগত)। কী বললেন? সনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, তেজস্বী যাদব, হেমন্ত সোরেন সবাই তাঁকে ফোন করেছেন কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি পরাজিত হননি, তাঁকে পরাজিত করা হয়েছে। এবং, অখিলেশ তো উত্তরপ্রদেশ থেকে অত পথ উজিয়ে কালীঘাটে এসে সশরীরে সান্ত্বনা দিয়ে গেছেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল আরও একধাপ এগিয়ে তাঁকে নাকি বলেছেন: দিল্লিতে যখন আমরা হেরে গেলাম, তখনও এমন দুঃখ হয়নি যেমনটা আপনার পরাজয়ে হচ্ছে।
এরপর?
এরপর তিনি সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়ার ডাক দিলেন আরও একবার। এবং সেইসঙ্গে, বাংলার বুকেও বিজেপির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে 'বাম ও অতিবাম'কে আহ্বান করলেন। সোজা বাংলায়, সিপিএম আর তাঁর কাছে ব্রাত্য নন। এবং, অতিবাম সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতা ও তাঁর স্নেহধন্য দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবার বামেদের সঙ্গে জোট করলেও, ফের তাঁর ঘনিষ্ঠবৃত্তেই ফিরে আসুক।
কিন্তু বামেরা কী বলছেন?
সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া অতি সংক্ষিপ্ত, "বিজেপিকে রুখতে হবে, এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই। বামপন্থী-সহ সমাজের সবস্তরের মানুষকে নিয়েই সেই কাজ করতে হবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী বলছেন, তা ঠিক বোঝা গেল না। উনি এখনও পদত্যাগ করেছেন নাকি করেননি, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে ওঁর কি কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা আছে? ওঁর কথায় সবাই আসবে কেন? ওঁর আমলেই তো বিজেপি ক্রমে-ক্রমে শাখা বাড়িয়েছে। উনিই তো বলেছিলেন, বিজেপি আমার ন্যাচারাল অ্যালি। বিজেপিকে ফ্রন্টে এনে লড়ব, এ-কথা কে বলেছিলেন? উনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। তাই ওঁর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সারা দেশে যখন বিজেপি-বিরোধী শক্তি জোটবদ্ধ হচ্ছে, তখন সেই ঐক্যে ফাটল ধরানো ওঁর উদ্দেশ্য ছিল।"
অধীরের কথা
একই কথা অধীর চৌধুরীর মুখেও শোনা গিয়েছে সম্প্রতি। অধীরের কথায়, চব্বিশের লোকসভার আগে বিজেপি-বিরোধী শক্তি জোটবদ্ধ হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর্জিতেই ইন্ডিয়া জোটের প্রথম বৈঠক হয় পাটনাতে। 'আহ্বায়ক' হন নীতীশ কুমার। ওই সময়ে জোটের মুখ হিসেবে কংগ্রেস কারুকে সামনে আনেনি। সবাই চেয়েছিল, নীতীশকে মুখ করে লড়তে। কিন্তু মমতা তাতে সায় দেন না। যার ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই নীতীশ ফের এনডিএ জোটে ফিরে যান। বিজেপি-বিরোধী জোট দুর্বল হয়।
পর্যবেক্ষরা কী বলছেন?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলায় বিজেপির জন্য জমি হলকর্ষণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। এই ১৫ বছরে শুধু যে আরএসএস-এর শাখা বেড়ে চলেছে, তা নয়। তৃণমূল সর্বক্ষণ বাঙালি-অস্মিতার কথা বললেও, হিন্দিবলয়ের ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতিকে বাংলায় লালন-পালন করেছে তারাই। ২০১১-র পর, পাড়ায়-পাড়ায় গণেশ পুজো থেকে শুরু করে রামনবমীর উদ্যোক্তা ছিলেন তো সুজিত বসুর মতো তৃণমূল নেতারাই। পুজো কার্নিভালে ডান্ডি-নাচ নেচেছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন হঠাৎ গুজরাতিরা খারাপ বাঙালিরা ভালো, হিন্দিভাষীরা খারাপ আর বাংলাভাষীরা ভালো, তা বললে চলবে কী করে? বরং তাতে ভাষায়-ভাষায় বিরোধ বাধবে।
প্রসঙ্গত, অদ্যাবধি দুর্গাপুজোর সময়ে বাংলার কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে দুদিনের মধ্যে দুশোটি পুজো প্যান্ডেল উদ্বোধন করতেও দেখা যায়নি। এবং, রোজার মাসে ইফতার পার্টিতে কলমা পরে সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তা দিতেও হয়নি।