গত বছরের অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ বাংলায় এসআইআর-এর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল নির্বাচন কমিশন। এবং নভেম্বের প্রথম সপ্তাহে বাড়ি-বাড়ি কড়া নেড়ে গণনা ফর্ম বিলি করতে শুরু করেন বিএলও-রা। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, একদিকে রাজ্যের শাসকদলের প্রতিরোধ এবং অন্য দিকে প্রশাসনের অসহযোগিতা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন। এমনকি, রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণে প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাওয়া ৬০ লক্ষ ভোটারের ভোট-ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের বিবেচনার উপর ( UNDER ADJUDICATION)।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে ফের আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তৃণমূল নেত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুর নিয়ে অভিযোগ তোলেন, বহু সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে সেখান থেকে। এমতাবস্থায়, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে পর-পর মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে বিভিন্ন জেলা থেকে। দাবি করা হয়, চূড়ান্ত তালিকায় নাম না-থাকায় আতঙ্কে ভুগছিলেন তাঁরা। ওই 'আতঙ্ক' থেকেই তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ আত্মঘাতী হন, কেউ-বা হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান। কারণ সেই একই, 'আতঙ্ক'।
জলপাইগুড়ি
দোলের দিন সকালে জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় এক মোমো বিক্রেতার দেহ উদ্ধার হল তাঁর ঘর থেকে। নাম গৌরাঙ্গ দে। পরিবারের দাবি, চূড়ান্ত তালিকায় নাম না-থাকায় আশঙ্কায় ছিলেন, বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে না তো? এবং সেই আতঙ্ক থেকেই আত্মহত্যা। খবর পেয়ে নয়াবস্তির এসআইসি কোয়াটার্সে ছুটে যান জলপাউগুড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান সৈকত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, "এখনও পর্যন্ত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি গণহত্যা হয়েছিল। এসআইআর দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ। গৌরাঙ্গ দে-র বয়স ৬২ বছর। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি ভোট দিচ্ছেন। কী করে তাঁর নাম বাদ দেয় কমিশন"?
দোলের দিন সকালে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় এই প্রৌঢ়ার দেহ উদ্ধার হয়। মোমো বিক্রি করে সংসার চালাতেন স্বামী-স্ত্রী মিলে। স্ত্রীর অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে আতঙ্কিত ছিলেন তাঁর স্বামী, তালিকায় নাম ওঠেনি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার উস্থি থানার ঘোলা নোয়াপাড়া এলাকায় প্রায় একই ঘটনা ঘটে। চূড়ান্ত তালিকায় নামের উপর বিবেচনাধীন ( UNDER ADJUDICATION) লেখা রয়েছে দেখে 'আতঙ্কে' গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন রফিক আলি গাজি। বয়স ৪৪ বছর। এদিন রফিকের দেহ নিয়ে পথ অবরোধ করে তৃণমূল। নির্বাচন কমিশন ও জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে স্লোগান দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ন্যায়বিচার চাই। যদিও প্রশ্ন, নামের উপর বিবেচনাধীন ( UNDER ADJUDICATION) থাকা মানেই 'বাদ' যাওয়া নয়, তা সত্ত্বেও কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন রফিক। তৃণমূল কর্মীদের দাবি, তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, কিন্তু তবুও আতঙ্ক কাটেনি।
পশ্চিম মেদিনীপুর
চূ়ড়ান্ত তালিকায় 'ডিলিটেড' বাবা এবং ছেলে। পরিবারের দাবি সেই আতঙ্কেই হাসপাতালে ভরতি হতে হয় বাবাকে। এবং সেখানেই মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের ডেবরা গ্রামে। যা নিয়ে শোরগোল পড়েছে এলাকায়। ২৮ তারিখের চূড়ান্ত তালিকায় 'ডিলিটেড' কৃষ্ণ পাল (৬৫) এবং তাঁর ছেলে দীপাঞ্জন পালের। আর তারপর থেকেই আতঙ্ক। শুনানি গিয়ে যাবতীয় নথিও দিয়ে এসেছিলেন বলে পরিবার কৃষ্ণ পাল। দাবি পরিবারের। কিন্তু তারপরেও 'ডিলিটেড' দেখে আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেন। সোমবার তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় মোটর সাইকেলে চাপিয়ে ডেবরা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভরতি করা হয়। সেখান থেকে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে রেফারের সময়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে এদিন শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন ডেবরা বিধানসভার তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। যাবতীয় তথ্য নিয়ে বিষয়টি ডেবরার বিডিও-র নজরে আনবেন বলে জানান তিনি।
চূড়ান্ত তালিকা
বাংলায় এসআইআর-পর্ব প্রাথমিকভাবে শেষ হয়েছে। এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এমতাবস্থায়, ৬৩ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ মৃত, কেউ স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট বা একইসঙ্গে দুই জায়গায় নাম রয়েছে এবং শুনানিতে গরহাজির। এছাড়াও কমবেশি ৬০ লক্ষের ভোট-ভবিষ্যৎ এখন সুপ্রিম-নির্দেশে বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION)। এঁদের ভোটভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। এই ৬০ লক্ষের মধ্যে কতজন 'যোগ্য' ভোটার, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এছাড়াও রয়েছেন 'ডিলিটেড ভোটার'। তাঁরা অবশ্য চাইলে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে আবেদন করতে পারেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আতঙ্ক এতই সংক্রামিত হয়েছে যে, আত্মহত্যা, হৃদরোগ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের দরুন মৃত্যু মিছিল অব্যাহত।