বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি কি ভাঙতে শুরু করেছে? 'বিকল্প' হিসেবে কি ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে বামেরা? পর্যবেক্ষকরা এই দুই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন খানিক ঘুরপথে, সরাসরি নয়। আইনি পরিভাষায় যাকে বলা হয় পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ বা সারক্যামট্যান্সিয়াল এভিডেন্স। কী সেই তথ্যপ্রমাণ?
প্রথমত, প্রতিদিন শূন্য-মহাশূন্য বলে যাদের কটাক্ষ করে রাজ্যের শাসকদল, তাদের 'প্রতীক'কে রীতিমতো বরণডালা সাজিয়ে কেন নিজেদের ঘরে নিয়ে এল তারা? এবং কেনই-বা তারপর থেকে অচেনা-অজানা এক-একজন বাম নেতাকে নিজেদের দলে এনে ঘটা করে প্রচার করে চলেছে তারা?
দ্বিতীয়ত, বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম নিষ্পত্তি না-করে বিধানসভা ভোট করা চলবে না, এই দাবি নিয়ে কমিশন দফতরের অদূরে কী করে রাতারাতি 'রাতদখল' করল বামেরা?
রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মনে করছে: হয় বামেদের সংগঠন আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে, নয় তো, তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি ভেঙে বাঁ-দিকে ঘেষছে মানুষ।
এই ব্যাখ্যার মাঝেই শুক্রবার শিল্পনগরী দুর্গাপুরে বামেরা বেশ অফবিট প্রচার শুরু ঘোষণা করল। সেখানকার বামকর্মীরা প্যামফ্লেট নিয়ে তাঁরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বলবেন: আপনার হাত ধরেই বাঁচবে বাংলা। মানুষের কাছ থেকেও তাঁরা পরামর্শ নেবেন, তাঁদের দাবিদাওয়া কী, কী চাইছেন তাঁরা। সিপিআইএম নেতা সিদ্ধার্থ বোস জানান, " আমদের স্লোগান হল, 'আপনাদের হাত ধরেই বামপন্থীরা ঘুরে দাঁড়াবে, আপনাদের হাত ধরেই বাঁচবে বাংলা'"।
বামেরা কী করতে চান, বামেদের এজেন্ডা কী, তা-ও স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে লাল রঙের প্যামফ্লেটে: আপনার হাত ধরেই বাংলা গড়ব, আমরা বলছি, চাকরি না-পাওয়া শিক্ষিত যুবদের কথা, লাঞ্ছিত-অসম্মানিত মহিলাদের কথা, মাকড়সার জালের মতো মাইক্রোফাইন্যান্সের জালে আটকে পড়া গৃহবধূদের কথা, স্থানীয় বেকারদের কথা ও পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা, পাট্টা না-পাওয়া গরিব বস্তিবাসীর কথা, ফুটপাথের দোকানদার টোটো চালক ও বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের কথা, অবহেলিত স্কুল শিক্ষার কথা, সরকারি স্কুলের কথা, দুর্গাপুর বাঁচানোর কথা।
একই দিনে, দুর্গাপুরে যখন প্রৌঢ় বামনেতারা এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করছেন, তার কাছাকাছি সময়ে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম ছাত্রযুবরা রীতিমতো অ্যাকশন মোডে! সুষ্ঠ পরীক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন, নির্ভুল রেজাল্ট প্রকাশ করা, পুরো সময়ের অধ্যাপক নিয়োগেক দাবিতে এসএফআই-এর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমারকাণ্ড ঘটল এদিন। অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তাঁরা দাবিসনদ জমা দিতে এলে তাঁদের সঙ্গে দেখা না-করে লোহার ফটক বন্ধ করে রাখে কর্তৃপক্ষ। ওই ফটক পেরোতে গেলে পুলিসের সঙ্গে এসএফআই সদস্যদের রীতিমতো ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ বলছেন, বাংলায় যখন ধর্মীয় মেরুকরণের উপর ভিত্তি করে বিধানসভা ভোট হচ্ছে, শাসক-বিরোধী রীতিমতো মন্দির তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন রাজনীতি সচেতন মানুষরা তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছেন। এবং তৃণমূল ও বিজেপির বাইনারি ভেঙে তাঁরা বামদের সমর্থন করছেন ও চাইছেন, অঘোষিতভাবে হলেও তলায়-তলায় বাম-কংগ্রেস জোট হোক। ছাব্বিশের বিধানসভায় বামেরা বড় কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলতে পারবে, তা নয় ঠিকই। কিন্তু, হারিয়ে যাওয়া জমি, হারিয়ে যাওয়া ভোট, শতাংশর হিসেবে আগের চেয়ে ভালো হবে। অন্তত তেমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।