বাংলায় প্রথম দফার নির্বাচনে রাজনৈতিক শিবিরের বিশেষ নজরে ছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্র। আশির দশকের মাঝামাঝি আরএসপি-অধ্যুষিত এই বহরমপুর থেকেই উত্থান হয়েছিল অধীর চৌধুরীর। একসময়ে কংগ্রেসের টিকিটে বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। তারও পর, কংগ্রেসের টিকিটে সাংসদ হয়েছিলেন তিনি। পরপর পাঁচবার। পদ্মার ভাঙন, বোল্ডার ফেলা নিয়ে দুর্নীতি, সবকিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তেইশে সাগরদিঘি উপনির্বাচনে অধীর-ম্যাজিকের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হয়েছিল তৃণমূল। যদিও, চব্বিশের লোকসভায় তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজিত হন তিনি।অধীরকে হারাতে প্রবল মেরুকরণের বাতাবরণ তৈরি করা হয়। তারপর, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদ থেকে অপসারিত হন তিনি। পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ মনে করেছিলেন, সত্তরে পা-রেখে এবার বোধহয় রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেবেন তিনি।
কিন্তু তিনি অধীর চৌধুরী। চিতাভস্ম মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার দুঃসাহস নিয়ে বেঁচে থাকেন তিনি। দীর্ঘ পাঁচদশকের রাজনৈতিক জীবনে যার অজস্র দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি। বামজমানায় তাঁর বিরুদ্ধে জোড়াখুনের মামলা, পুলিস, আইন-আদালত সব পেরিয়েই 'বহরমপুরের রবিনহুড' হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভায়, সদ্য সন্তানহারা এক দম্পতি সন্তানের দেহ বাড়িতে রেখেই বুথে গিয়েছিলেন অধীর চৌধুরীকে ভোট দিতে!
খেলা ঘুরল মুর্শিদাবাদে
চব্বিশের লোকসভায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে অধীর চৌধুরী ভোটে হারলেন ঠিকই। তবে কিছুদিনের মধ্যেই মুর্শিদাবাদের মানুষ হাড়ে-হাড়ে টের পেলেন, খাল কেটে কুমীর এনেছেন তাঁরা। এবং, সেই কুমীরের নাম: ধর্মীয় মেরুকরণ।
ইতিমধ্যেই ওয়াকফ-আন্দোলন ও তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গে জেলায় তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ধস নেমে গেছে। পরিযায়ী-ইস্যুতে শাসকশিবির গলা ফাটালেও শোক-সন্তপ্ত পরিবারের পাশে সবার আগে দেখা গেল অধীর চৌধুরীকে। কখনও ঝাড়খণ্ড প্রশাসনের সঙ্গে কথা, কখনও-বা তামিলনাড়ুর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা, জেলার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে আন্তরিকতার ছোঁয়া পান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। এবং, লোকসভায় অধীর চৌধুরীকে ভোট না-দেওয়ার জন্য তাঁদের অনেকেই সন্তপ্ত হন।
এদিকে ভরতপুরে হুমায়ুন কবীর ক্রমাগত তাঁর দল তৃণমূলকে বিড়ম্বনায় ফেলে চলেছেন তখন। দল তাঁকে গিলতেও পারছে না, উগরোতেও পারছে না। তৃণমূলের জেলা পরিষদের সদস্যরা একে-একে অধীর চৌধুরীর হাত ধরে কংগ্রেসে ঘরওয়াপসি করতে শুরু করেন। এবং, ছাব্বিশের বিধানসভার আগে ফের রবিনহুড মেজাজে দেখা যায় অধীরকে। প্রায় তিন দশক পর, বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ফের কংগ্রেসের টিকিটে ভোটের ময়দানে নামেন তিনি।
'সন্ত্রাসের অ-আ-ক-খ'
বাংলায় ভয়শূন্য ভোট করাতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন। কমিশনের এক-একটা পদক্ষেপ বিতর্কের জ্বালামুখ খুলে দিচ্ছে। এবং, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশই আশ্বস্ত হচ্ছেন: এবার তাহলে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবো।
যদিও, অধীর চৌধুরী কিন্তু তখনও সন্দিহান। কারণ, বাংলায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধরন বরাবরই অন্যরকম। এমতাবস্থায়, ১১ মার্চ (২০২৬) এক সাংবাদিক বৈঠক থেকে অধীর চৌধুরী বলেন, " এখন থেকেই শুরু হয়েছে হুমকি। মুর্শিদাবাদের দুই কংগ্রেসের নেতার নাম কোচবিহার থেকে মিথ্যা মামলা করেছে পুলিস। এখানে সন্ত্রাসের ধরন একেবারে অন্যরকম। বিরোধী দলের এজেন্ট যাতে বুথে বসতে না-পারে, তার জন্য পুলিস আগে থেকে হুমকি দেয়। পশ্চিমবঙ্গে শুধু কি ভোটের দিন সন্ত্রাস হয়? সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করে ভোট হয়। দেখবেন, ভোটের দিন হয়তো কোনও ঝঞ্ঝাট নেই। এখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে খাইয়ে-দাইয়ে ফিট করে প্রক্সি ভোট চলে। বুথে বিরোধী দলের এজেন্টকে বসতে দেওয়া হয় না। তাঁরা যদি-বা সাহস করে বসেন, তাহলে তাঁদের বাড়ি গিয়ে হামলা চালানো হয়। কোথায় আছে নির্বাচন কমিশন? পশ্চিমবঙ্গে সন্ত্রাসের অ-আ-ক-খ জানে না কমিশন"।
প্রথম দফার ভোট, সক্রিয় কমিশন
এদিন প্রথম দফার ভোট হল। এবং মনে হল, 'বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি'।
প্রবল গরমে, প্রবল উৎসাহে, প্রবল উদ্দীপনায় বহরমপুরের মানুষ লাইন দিয়ে ভোট দিয়েছেন। এবং, নির্বিঘ্নেই। সাংবাদিক বৈঠক থেকে এদিন তাই অধীর চৌধুরীকে বলতে শোনা গেল, "যেখানেই কোনও সমস্যা হয়েছে কমিশনকে জানিয়েছি, তারা পদক্ষেপ করেছে। তবে কিছু বুথে শ্লথগতিতে ভোট হয়েছে। বিরোধীদের কাছে যা কাম্য নয়। তবে কমিশনকে জানিয়ে কাজ হয়েছে"।
তাহলে কমিশন ভালো কাজ করেছে বলছেন?
পোড়খাওয়া রাজনীতিকের মতোই অধীরের উত্তর, "এসআইআর নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে বলার দরকার ছিল, বলেছি। আবার, এদিন ভালো কাজ করেছে কমিশন। তাই ভালোকে ভালোই বলব। আমি তো আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নই"।
এবার তাহলে অধীর চৌধুরীর পুনরুত্থান?
বহরমপুরের রবিনহুড বললেন, "আমাকে হারাতে এবারও তৃণমূল আর বিজেপি এককাট্টা। বহরমপুরে তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে সেভাবে কিছু বলেনি প্রচারে। অন্যদিকে, বিজেপিও সেভাবে কিছু বলেনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিজেপি চেয়েছে মুসলিম ভোট সব তৃণমূলে যাক। অন্যদিকে, তৃণমূল চেয়েছে হিন্দুভোট বিজেপি পাক। যাতে করে অধীর চৌধুরীকে হারানো যায়। তবে, জেলায় আমাদের ভোট বাড়বে এবার"।
'আমি' নই 'আমরা', 'আমাদের ভোট'। মে মাসের ৪ তারিখ ভোটের ফল যা-ই হোক-না কেন, অধীররঞ্জন চৌধুরীর জয় কিন্তু এখানেই।