নীতীশ কুমারকে সামনে রেখে যখন বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া জোট গড়ে তোলা হচ্ছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় বাদ সাধেন এবং জোটকে ঘেঁটে দিয়ে পরোক্ষ ভাবে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেন, মন্তব্য কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর। প্রসঙ্গত, এদিন ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে ফেলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কী বলেছেন মমতা?
ভোটরক্ষার দাবিতে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দেন, "তেমন হলে কেন্দ্রীয় সরকারকেই ফেলে দেবো"। এবং তার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়। আগাগোড়া নির্বাচন কমিশন আর বিজেপিকে একই বন্ধনীতে রেখে তোপ দেগেছেন মমতা। কিন্তু এসআইআর ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে ফেলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি শোনা তাঁর মুখ থেকে।
পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন, লোকসভায় তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদ রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মোদী সরকারকে ফেলে দেওয়ার পক্ষে তা কি যথেষ্ট? রাজধানীর রাজনৈতিক মহল মনে করিয়ে দিচ্ছে, চব্বিশের লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় বিজেপি। এবং সরকার গড়তে অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু ও বিহারের নীতীশ কুমারের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। এদিন ধর্মতলার মঞ্চ থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে মমতাকে বলতে শোনা যায়, চন্দ্রবাবু নাইডুর সমর্থনে টিমটিম করে চলছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নীতীশ কুমার জেডিইউ এবং চন্দ্রবাবুর টিডিপি-র মধ্যে কেউ যদি সমর্থন তুলে নেয়, তাহলে মোদী সরকারকে আস্থাভোটে যেতে হবে। এবং এডিএ-র বাইরে জোটসঙ্গি খুঁজতে হবে। এমতাবস্থায়, তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদ মহার্ঘ্য হয়ে উঠবেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের কাছে। এদিন এই সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক কষে মোদী সরকারকে মনে করিয়ে দিলেন, আস্থাভোট হলে মোদী সরকারকে সমর্থন করবেন না তৃণমূল সাংসদরা।
প্রসঙ্গত, প্রথমে বিজেপি বিরোধী ইউপিএ জোট ও পরে ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম প্রতিনিধ হয়েও কিন্তু, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশের সময়ে তৃণমূল সাংসদরা ভোটদানে বিরত থেকে মোদী সরকারের সুবিধা করে দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এমতাবস্থায়, কোনও জরুরি বিল পাশ বা জোট শরিকদের কেউ ছেড়ে চলে গেলে তৃণমূলের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না নরেন্দ্র মোদীর কাছে, সেই কথাই মনে করিয়ে দিলেন মমতা।
কী বলছেন অধীর?
"ইন্ডিয়া জোট যখন তৈরি হয়েছিল নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে, তখন তাঁকে সবাই মেনে নিয়েছিলেন। মানেননি শুধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন যদি নীতীশের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোট হত, তাহলে কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারতো না। এ কথা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। সেইদিন বিজেপির সুপারি খেয়ে, ইন্ডিয়া জোট ঘেঁটে দিয়ে ভারতবর্ষে যদি কারুর উপকার করে থাকেন, তাহলে তার বিজেপি। ইন্ডিয়া জোট যেভাবে তৈরি হচ্ছিল তখন, তাতে করে বিজেপি ২০০ শতাংশ ধরাশায়ী হওয়া অনিবার্য ছিল। আজ উনি বলছেন বিজেপি সরকার ফেলে দেবেন। ভালোই তো, আমরা দেখবো", মোটের ওপর এ-ই হল অধীর চৌধুরীর বক্তব্য।
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২৩-এর মাঝামাঝি বিজেপি-বিরোধী জোট গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও, এনডিএ-র বিপরীতে ইউপিএ-জোটকে অচলমুদ্রা বলে মনে করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (যদিও ইউপিএ জোটের সৌজন্যে বাংলায় কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হয় ২০১১ সালের পালাবদলের নির্বাচনে)। মমতার অনুরোধে জেডিইউ-র নীতীশ কুমার বিজেপি-বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের প্রথম বৈঠক দিল্লিতে না-ডেকে পাটনায় ডাকেন। এমতাবস্থায়, শরদ পাওয়ার থেকে শুরু করে রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে সবাই চান, নীতীশ কুমারকে মুখ করে বিজেপি বিরোধী জোট গড়ে উঠুক। কিন্তু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে বাদ সাধেন। এবং তার কিছুদিনের মধ্যে কার্যত হতাশ হয়ে নীতীশ ফের এনডিএ জোটে ফিরে যান। চব্বিশের লোকসভায় ইন্ডিয়ো জোটের বিরুদ্ধে লড়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এবং টিডিপি-র চন্দ্রবাবু নাইডু ও জেডিইউ-নীতীশ কুমারের সমর্থনে সরকার গড়তে হয় নরেন্দ্র মোদীকে। রাজধানীর রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে, নীতীশ কুমার যদি ওই সময়ে মমতার বাধায় বিরক্ত হয়ে ইন্ডিয়া জোট না-ছাড়তেন, তাহলে শরিকদের নিয়েও চব্বিশে বিজেপি আদৌ সরকার গড়তে পারতো কি না সন্দেহ।