মণি ভট্টাচার্য: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশ চিক বড়াইক এবং সুস্মিতা দেবের বিজেপিতে যোগদান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন...
মণি ভট্টাচার্য: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশ চিক বড়াইক এবং সুস্মিতা দেবের বিজেপিতে যোগদান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কারণ, কিছুদিন আগেই তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, "তৃণমূল থেকে কাউকে বিজেপিতে নেওয়া হবে না।" অথচ সেই তিনিই পরে এই তিন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদের হাতে বিজেপির পতাকা তুলে দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন—তাহলে কি শমীক ভট্টাচার্য নিজের কথাই রাখলেন না?
কিন্তু রাজনীতিকে যদি শুধুমাত্র একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে বৃহত্তর ছবিটা চোখ এড়িয়ে যায়।
ভারতীয় জনতা পার্টি এমন একটি রাজনৈতিক দল, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করে। বিশেষ করে রাজ্যসভার সাংসদদের মতো জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক সম্পদকে নিয়ে সিদ্ধান্ত রাজ্য নেতৃত্ব এককভাবে নেয়—এমন ধারণার পক্ষে বাস্তব উদাহরণ খুব কম। ফলে এই তিন নেতাকে বিজেপিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তও যে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের সম্মতিতেই হয়েছে, তা অনুমান করা অযৌক্তিক নয়।
প্রশ্ন হল, কেন এই সিদ্ধান্ত?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সংসদের অঙ্কে। বর্তমানে রাজ্যসভার ২৪৫টি আসনের মধ্যে বিজেপির নিজস্ব সাংসদ সংখ্যা ১১৪। এই তিন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ বিজেপির সঙ্গে এলে সেই সংখ্যা বেড়ে হবে ১১৭। এনডিএ-র সম্মিলিত শক্তিও আরও বাড়বে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মাত্র দুই বা তিনটি ভোটও অনেক সময় ঐতিহাসিক আইন পাস করানো বা বিরোধীদের বাধা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
রাজ্যসভাই সেই কক্ষ, যেখানে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল সংখ্যার অঙ্কে আটকে যায়। অতীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন পাশ করাতে সরকারকে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে সংখ্যা বাড়ানো বিজেপির কাছে শুধুই রাজনৈতিক সম্প্রসারণ নয়, এটি সংসদীয় কৌশলেরও অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য এবং পরবর্তী ঘটনাকে একই সরলরেখায় বিচার করলে ভুল হবে। তিনি রাজ্য সভাপতি হিসেবে একটি রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে বা সংসদীয় কৌশলের প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি অন্য সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাস্তবতা।
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত নয়, শমীক ভট্টাচার্য কথা রাখলেন কি রাখলেন না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত রাজ্যসভার সংখ্যার অঙ্কে সুবিধা পেতেই কি বিজেপি এই সিদ্ধান্ত নিল?
রাজনীতিতে বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার অঙ্ক। আর সেই অঙ্ক যখন দিল্লিতে লেখা হয়, তখন কলকাতার নেতারা অনেক সময় শুধু সেই সিদ্ধান্তের ঘোষক হন, সিদ্ধান্তের রচয়িতা নন।