'বাঁ-দিক চেপে, বাঁ-দিক চেপে'।
মহাকাশগামী নভোচরের ভূমিকায় দেখা গেলেও, স্কুল বাসের হেল্পার হয়ে মহিলাদের কাজ করতে দেখা যায় না। এমতাবস্থায়, 'ট্রান্সপোর্ট লাইনে' যাঁদের বলা হয় খালাসি বা হেল্পার, সংসার চালাতে সেই পেশাকে বেছে নিয়েছেন গৃহবধূ মানসী মাইতি। আন্তর্জাতিক নারীদিবসে কাঁথির এই গৃহবধূর অনুচ্চারিত বার্তা: 'নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী'। তাই, চলন্ত গাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়নক এক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁকে বলতে শোনা যায়: বাঁ-দিক চেপে, বাঁ-দিক চেপে। নইলে অভাবের সংসার থেকে 'আশ্চর্য ভাতের গন্ধ' বেরোবে কী করে?
‘পুরুষের কাজ’?
পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পর্ব শিখর অবধি পৌঁছিয়েছে মেয়েরা। নভোচর হয়ে ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে এসেছে মেয়েরা। মাওবাদী হয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে স্বয়ক্রিয় রাইফেল তুলে নিয়েছে মেয়েরা। সেনাবাহিনীতেও সমান বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে মেয়েরা। তাই, আলাদা করে ‘পুরুষের কাজ’ বলে কিছু হয় না, মনে করছেন মানসী। এবং সেই কারণেই, নিজের সংসার সামলে, সমাজের বাধা পেরিয়ে, সাত বছর ধরে স্কুলবাসের হেল্পার হয়ে কাজ করে পরিবারের অন্যতম উপার্জনকারী হয়ে উঠেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই বিশেষ দিনে আমরা যখন নারী শক্তির কথা বলি, তখন বড় বড় সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি উঠে আসে নীরব সংগ্রামের কাহিনিও। তেমনই এক সংগ্রামের নাম— মানসী মাইতি। বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকে।
একটি বেসরকারি স্কুলের বাসে হেল্পারের কাজ করেন মানসী। প্রথমে শুনলে অনেকেই অবাক হন আর বলেন, ‘এ তো পুরুষের কাজ’। সেই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে মানসীর উত্তর, "সেভাবে কোনও কাজই 'পুরুষের কাজ' নয়, চাইলে সব কাজই সবাই করতে পারে"। এবং তাই, সাত বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে চলেছেন তিনি।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাঁর দিন। সংসারের কাজ সামলে তিনি পড়ি-কি-মরি করে পৌঁছে যান স্কুলে। সেখান থেকে স্কুলবাসে নিয়ে বেরোন। মা-বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পড়ুয়াদের এক-এক করে বাসে তুলে নেন। বাড়ি থেকে স্কুল আর স্কুল থেকে বাড়ি, গোটা পথজুড়ে ছোটদের আগলে রাখেন— পরম স্নেহে। চলন্ত বাসের দরজায় দাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে বলে যান, 'বাঁ-দিক চেপে, বাঁ-দিক চেপে'।
'ট্রান্সপোর্ট লাইনে' এই কাজ রীতিমতো ঝক্কির। নিত্যদিন সেই ঝক্কি সামলাতে গিয়ে মানসী কিন্তু জীবনবিমুখ হয়ে ওঠেননি। তাই তাঁর স্পর্শে মাতৃস্নেহ অনুভব করে ছোট-ছোট পডুয়ারা। নিশ্চিন্তে থাকেন পড়ুয়াদের মা-বাবারাও। তবে, মানসীর এই যাত্রা-পথ মোটেও সহজ ছিল না। সমাজের কটাক্ষ, হাজারো প্রশ্ন, আর্থিক অনটন— যাবতীয় চ্যালেঞ্জকে চ্যালেঞ্জ করে এই পেশায় আসেন তিনি। তারপর শুরু হয় লড়াই। যা, দ্রুতগামী চলমান বাসের দরজা থেকে দেখা রাস্তার মতোই সবকিছুকে পিছনে ফেলে দেয়। স্বামীর ছোটখাটো ব্যবসায় সংসার চলে না। এহেন অনটনের মধ্যে হাল ছেড়ে দেওয়ার বদলে ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো বলে মনে করেন মানসী তিনি।
'বাঁ-দিক চেপে। বাঁ-দিক চেপে।' রাস্তার বাঁ-দিকেই তো ছোট-ছোট পডু়য়াদের পথ-নিরাপত্তা। এবং, অভাবী সংসারে দু-বেলা দু-মুঠো অন্নের নিরাপত্তা। আর অবশ্যই, 'আশ্চর্য ভাতের গন্ধ'।