এককথায় বাঙালি বড় ভোজন রসিক। ভোজনে রসনাপ্রিয় খাবারের ক্ষেত্রে বাঙালি এককদম এগিয়ে। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমাদের মতো সাধারন মানুষতো আছেই তবে বাঙালি মনিষীরা কম যান না। আলোচনা শুরু করলাম রামমোহন রায়কে নিয়ে। রামমোহন রায় খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে ছিলেন সবার আগে। একটা গোটা পাঠা অবলীলাক্রমে খেয়ে ফেলতেন। দুধ খেতেন দিনে দশ/ বারো সের। এছাড়া ৫০ টা আম আর এক কাঁদি নারকেল খাওয়া ওনার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। প্যারীমোহন সরকার ও বিদ্যাসাগর মশায় এনারা দুজনেও ভোজনে কম যান না। প্যারীমোহন জলখাবার খেতেন এক ধামা মুড়ি ও শ’খানেক মূলো। কোনো নিমন্ত্রন বাড়িতে বাজি ধরে সমস্ত খাওয়া দাওয়ার পর খেয়ে ছিলেন এক সের ছানাবড়া। বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর যোগ্য সহচর। ওকটা পাঠা দুই বন্ধু মিলে অর্ধেকটা প্রায় সাবাড় করে দিতেন।
অন্যদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও কর্ম যান না পেটভরে পোলাও মাংস খাওয়ার পর, দু সের রসগোল্লা অম্লান বদলে খেয়ে ফেলতেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ একাই তিন/চার জনের খাবার খেয়ে ফেলতেন। পাশাপাশি আমিষ ও নিরামিষ দুটোতেই বাঙালির রান্না খ্যাতি সবর্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। পরাধীন ভারতের ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড, যুবরাজ থাকা কালীন ভারতের ভ্রমনের সময়, ভবানীপুরে এক নিমন্ত্রন বাড়িতে বাঙালীর রান্নার প্রশংসা করে গেছেন। কলাপাতার ওপর মিহি চালের ভাতের সঙ্গে নানান দর্শনধারী পদের গুন ও স্বাদকে তিনি কাব্যিক রূপে তাঁর বর্ণনা করেছেন।
শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধে যে বিপুল খরচ করেছিলেন সেই সময়ে, শুনলে চক্ষু চড়কগাছ। সেই সময়ে আনুমানিক দশলক্ষ টাকা। কলকাতার সমস্ত মুদির দোকানের চাল ডাল ফুরিয়ে গিয়েছিল। কুমোর টুলিতে একটিও মাটির হাড়ি অবশিষ্ট ছিল না। কোথাও ছিল না কলাগাছের আস্ত পাতা। নবকৃষ্ণের এই নিমন্ত্রন এখনো ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।
ইতিহাসে সাক্ষ্য দিচ্ছে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে খাওয়া আর খাওয়ানোর ব্যাপারে বাঙালিদের মতো ভোজনপ্রিয় ও ভোজনরসিক জাত সত্যিই বিরল। তবে এখন আর নিমন্ত্রনের বহর নেই। পেটুকদেরও হিম্মত নেই। আছে হারিয়ে যাওয়া কিছু সুখকর স্মৃতি।